মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ১১ অক্টোবর ২০১৩, ২৬ আশ্বিন ১৪২০
শিক্ষার গুণগত সমস্যা ॥ পোশাক খাতের রফতানি সমস্যা
ড. আর. এম. দেবনাথ
কোনটা রেখে কোনটার ওপর লিখি? একটি বিষয় চোখে পড়ল যা শিক্ষা খাতের সমস্যা। একই কাগজে একই দিনে আরও দুটো খবর পড়লাম যেগুলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ। একটা খবর পোশাক খাতের ওপর। আরেকটা খবর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আই এমএফ) ওপর। উচিত মতে শিক্ষার সমস্যাটিকে বেশি গুরুত্ব দিতে চাই। কারণ শিক্ষার মাধ্যমে ‘গাছ’ লাগালে এর ফল পাওয়া যায় অনেক পরে। ফল ভাল হোক মন্দ হোক তখন আর কিছু করার থাকে না। দেখা যাচ্ছে আমাদের শিক্ষার মান নিম্নমুখী, এটা আমার মুখের কথা নয়, কথাটা বলেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তাও সংসদে। প্রশ্নটি ওঠে ‘এমপিও ভুক্তি’ নিয়ে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, (৭.১০.২০১৩) অতিমাত্রায় ‘এমপিওভুক্তি’ শিক্ষার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এমন কি কেউ আছেন যিনি তাঁর এই মতের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন। পরিস্থিতিটা কি তা বোঝার জন্য একটা উদাহরণ দিই। আমি এমন একটা প্রাইমারী স্কুলের কথা শুনেছি যার কমিটির প্রধান হচ্ছেন ওয়ার্ড মেম্বারের অশিক্ষিত স্ত্রী। ওয়ার্ড মেম্বার নিজেও ‘বকলম।’ গণতন্ত্রে, শিক্ষায় গণতন্ত্রের এটা একটা ফল। সংখ্যা, না গুণ এই প্রশ্নে আমাদের শিক্ষাখাত আক্রান্ত। আমরা সংখ্যা বা পরিমাণগত দিকের প্রতি নজর দিয়ে শিক্ষার গুণগত দিক নষ্ট করে ফেলছি। আমরা উচ্চশিক্ষা নষ্ট করছি। আমরা মাধ্যমিক শিক্ষা নষ্ট করছি, আমরা প্রাথমিক শিক্ষা নষ্ট করছি। পরিস্থিতি আজ এমন হয়েছে যে, গ্র্যাজুয়েট, মাস্টার্স ডিগ্রি পাস ছেলেমেয়েদের একটা বিরাট অংশ শুদ্ধ বাংলা বা ইংরেজীতে চিঠি লিখতে পারে না। চাকরির জন্য দরখাস্ত লিখতে পারে না, যোগাদানপত্র লিখতে পারে না। শুধু সার্টিফিকেট বিক্রির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরির কি কোন প্রয়োজন আছে। আমি অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে পুরো একমত হয়ে বলতে চাই, দয়া করে গুণগত দিকে নজর দিন। ‘চিঠি লিখতে না পারা’ শত গ্র্যাজুয়েট তৈরি করার চেয়ে ‘চিঠি লিখতে জানা’ পঞ্চাশ জন গ্র্যাজুয়েটও ভাল। সংখ্যাগত/ পরিমাণগত কাজ যথেষ্ট হয়েছে; এবার গুণের দিকে নজর দিন। বিদেশীদের টাকা, সাহায্যের টাকা পেলেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার প্রবণতা বন্ধ হোক।
এবার আসা যাক ‘আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের’ প্রশ্নে। এই সংস্থাটির অফিস বাংলাদেশ ব্যাংকে। এদের লোক সবকিছু তদারকি করে। দুদিন পরপর তাদের লোক বাইরে থেকেও আসে। আসে আমরা কি করছি, কেমন করছি তা দেখার জন্য। এটা তারা এমনিতেই করে। তাদের সঙ্গে যুক্ত বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক। একটার কথার সঙ্গে আরেকটা সুর মেলায়। একজন অসন্তুষ্ট হলে আরেকজন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অসুন্তুষ্ট হয়। এবার দেখছি ‘সন্তুষ্টির’ পালা। মোট ঋণ তারা দেবে ১০০ কোটি ডলার। এর একটা কিস্তি আগামী ডিসেম্বরে প্রাপ্য। পরিমাণ ১৪ কোটি পাঁচ লাখ ডলার। আশি টাকা ডলার দরে হয় মোটামুটি ১১শ’ ১২শ’ কোটি টাকা। খুব বেশি টাকা নয়। কিন্তু এটা দিতে গিয়েই কত রকমের শর্ত। কত রকমের কথা। দুদিন আগে তারা ফাটাফাটি করল সরকারী ব্যাংক নিয়ে। খুবই অসন্তুষ্ট তারা। এবার সারা অর্থনীতি নিয়ে কথা বলছে তারা। এবার তারা সন্তুষ্ট। তারা বলছে, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আছে। অন্যান্য দেশের তুলনায় অর্থনীতি স্থিতিশীল আছে। খাদ্য পরিস্থিতি ঠিক আছে ইত্যাদি ইত্যাদি। ‘আইএমএফ’-এর ‘সার্টিফিকেট’ কি দরকার ছিল? আমার মতে, আদৌ দরকার ছিল না। চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি জিনিসপত্রের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল। মাছের দাম স্থিতিশীল। ইলিশ মাছ তো এখন আগের তুলনায় বেশ সস্তা। শাক-সবজির দামও ঠিক আছে। চালের দাম স্থিতিশীল। পেঁয়াজের দাম একটু চড়া। সরকার টিসিবির মাধ্যমে খোলাবাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করে বাজার কিছুটা ঠা-া রেখেছে। সামনে ঈদ। রয়েছে পুজো। এই দুই পরব উপলক্ষে অনেক জিনিসের চাহিদা বেশ বেড়েছে। এর কুফল কিছু কিছু ক্ষেত্রে আছে, এটা নতুন কিছু নয়। বরাবরের চিত্র।‘জিডিপি প্রবৃদ্ধিও অন্যান্য দেশের তুলনায় খুবই ভাল। প্রতিবেশী ভারতরে তুলনায় বেশ ভাল। কেবল একটা অশান্তি আছে। সেটা নির্বাচনকালীন অশান্তি। অনিশ্চয়তা আছে নির্বাচনের ক্ষেত্রে। এ কারণে বিনিয়োগে স্থবিরতা আছে, কাজ-কর্মে স্থবিরতা আছে। এটাও বরাবরের ঘটনা। নতুন কিছু নয়। সার্বিক বিবেচনায় অবশ্যই অর্থনীতির অবস্থা স্থিতিশীল ও ভাল। ঢাকা শহরের বাজে একটা সমস্যা আছে, যার কারণে লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, লাখ লাখ লোক ভুগছে-সেটা যানজট। বিমানবন্দর থেকে রামপুরা-বাড্ডা হয়ে মূল শহরে আসতে ছিল ভীষণ জ্যাম। এখন উড়ালপুল হওয়াতে সেই জ্যাম পরিস্থিতির বেশ কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ফলে উত্তরবঙ্গ, ময়মনসিংহ ইত্যাদি অঞ্চলের লোকের কিছুটা স্বস্তি মিলছে। এদিকে সায়েদাবাদ পলাশী উড়াল পুল। দু’তিন বছর কাজ শেষে ২২০০ কোটি টাকার এই উড়াল পুল আগামী ১১ অক্টোবর (শুক্রবার) থেকে খুলে দেয়া হবে। এই উড়াল পুলের নির্মাণ কাজের জন্য পুরনো ঢাকার লোকদের ভোগান্তির কোন শেষ ছিল না। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, চাঁদপুর, ফেনী, লাকসাম, কুমিল্লা ইত্যাদি অঞ্চলের লোকেরা তিতিবিরক্ত ছিল। তিতিবিরক্ত ছিল ছিল ভৈরব, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং বৃহত্তর সিলেটের লোকেরা। আশা করা যায় ১১ অক্টোবরের পর তাদের দুঃখ-দুর্দশা কিছুটা লাঘব হবে। পরিবহন বাদে অর্থনীতির অন্যান্য প্রধান সূচকের অবস্থাও ইতিবাচক। মারাত্মক খারাপ কিছুর আলামত নেই। বিদ্যুতের লোডশেডিং একটু বেড়েছিল। ভারত থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত আমদানি শুরু হওয়ার পর এতেও স্বস্তি মিলবে বলে আশা করা যায়। ক্ষেতের ফসলও ভাল। দেশের জমিনে এখন আমন ফসল। আমন ফসল ভাল হবে এটা বোঝা যাচ্ছে। সবচেয়ে ভাল খবর উত্তরবঙ্গের। এই অঞ্চলে এই সময়ে লাখ লাখ লোক উপোস করত, আক্রান্ত হতো ‘মঙ্গায়’ (মেগে খাওয়া) আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীদের বদৌলতে নতুন জাতের ফসল উৎপাদন করে উত্তরবঙ্গের চাষীরা ‘মঙ্গা’ থেকে মুক্ত হয়েছে।এই নতুন ফসলটি ওঠে আমনের আগে, যখন ধান-চালের ভীষণ অভাব থাকত। এবারও নতুন জাতের ধানের ফলন ভাল। বাজারে নতুন শিম, মুলা ও বিভিন্ন ধরনের সবজিও উঠছে। কোথাও কি খাবারের জন্য, সবজির জন্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য হাহাকার আছে? না, তা নেই।
অবশ্য একটা খারাপ খবর দিচ্ছেন পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা, যাঁরা সেলাই কারখানার মালিক। তাঁরা বলছেন, জুলাই মাসের তুলনায় আগস্ট মাসে পোশাক রফতানির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। গত ৬ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে ‘বিজিএমআইএ’ নেতৃবৃন্দ নানা আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছেন। তাঁরা বলেছেন, ‘রানা প্লাজার’ নারকীয় ঘটনার পর পোশাক রফতানির অর্ডার কমছে। এসব যাচ্ছে ভিয়েতনাম ও ভারতে। তারা বলছেন, ভারত ও ভিয়েতনাম এখন নতুন প্রতিযোগী। তারা আরও অভিযোগ করেছেন, ব্যাংকের সুদের হার বেশি। এই হারে ব্যবসা করা যায় না। অবশ্য প্রধান কথা অন্যটি। বিগত কয়েক মাসে ভারতের ‘রুপির’ দাম ডলারের বিপরীতে হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে আমাদের টাকার মান ডলারের বিপরীতে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের ‘রুপির’ অবমূল্যায়ন হয়েছে-তাদের হিসাবে, ২৭ দশমিক ৯১ শতাংশ। আর আমাদের টাকার দরবৃদ্ধি পেয়েছে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। তাদের মতে, অতএব, বাংলাদেশের পোশাক খাতের রফতানি সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে মোট প্রায় ৩৭ ভাগ। আরেকটা হিসাব তাঁরা দিয়েছেন। ভিয়েতনামে পোশাক খাতে নিয়োজিত শ্রমিকের সংখ্যা ১৫ লাখ, আর আমাদের ৪০ লাখ। ভিয়েতনাম পোশাক রফতানি করে এক হাজার ৭০০ কোটি ডলার। এই হিসাবে আমাদের এই খাতে রফতানির পরিমাণ হওয়ার কথা চার হাজার ২০০ কোটি ডলার। কিন্তু নিম্ন উৎপাদনশীলতার কারণে আমাদের রফতানি অনেক কম। এসব হিসাব দিয়ে পোশাক কারখানার মালিকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, আমাদের পোশাক খাত ‘ল-ভ-’ হয়ে যেতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য তাঁরা সরকারের সহায়তা চেয়েছেন। পোশাকখাতের সমস্যা সম্বন্ধে সরকার যেমন ওয়াকিফহাল তেমনি দেশবাসীও ওয়াকিফহাল। এটা আমাদের অর্থনীতির ‘লাইফলাইন।’ আেেরকটা ‘লাইফলাইন’ হচ্ছে ‘রেমিটেন্স।’ এ দুটো খাতের ওপর আমরা দাঁড়িয়ে আছি। বহুদিন ধরে আমি লিখে আসছি বিষয়টা খুবই জটিল হয়ে পড়ছে। একটা অর্থনীতি শুধু দুটো পণ্যের রফতানির ওপর নির্ভর করবে তা কোনভাবেই কাম্য নয়। কারণ এই অবস্থায় একটায় সমস্যা হলে পুরো অর্থনীতিতে ধস নামবে। এছাড়া চিরদিন আমরা রফতানি বাজারের ওপর নির্ভরশীল থাকতে পারব না। দরকার অভ্যন্তরীণ বাজার। অভ্যন্তরীণ বাজার বড় হয়েছে। কিন্তু আরও বড় হওয়া দরকার। মানুষের সঞ্চয় নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান- এনজিও, এমএলএম কোম্পানি ইত্যাদি মেরে দিচ্ছে। সরকার নানা কায়দায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সঙ্কুচিত করছে। বর্ধিত হারে কর বসাচ্ছে। ভোগেও কর, আয়েও কর। ভ্যাট সম্প্রসারণের ফলে সকলের ভোগের খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার আয়কর বৃদ্ধি, আয়কর রেয়াত হ্রাস, সঞ্চয়ে নিরুৎসাহীকরণ ইত্যাদির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি তো আছেই। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ঠিক রাখতে না পারলে, বৃদ্ধি না করতে পারলে বাজার বড় হবে কিভাবে? অভ্যন্তীণ বাজার বড় না হলে বিদেশ নির্ভরতা কমবে কিভাবে? এসব প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে। অথচ নির্ভরশীলতা কমছে না। এখন দেখা যাচ্ছে রেমিটেন্সেও টান পড়ছে। পোশাক রফতানিতেও টান পড়ছে। যদি এ দুটো প্রবণতা অব্যাহত থাকে তাহলে সামনের বিপদ কেউ ঠেকাতে পারবে না। সরকারকে বলব সাবধান হতে। কথা আছে। কথাটা টাকার মূল্য নিয়ে। মূল্য মানে ডলারের বিপরীতে। দেখাই যাচ্ছে ডলারের বিপরীতে আমাদের টাকার মান বড়েছে আর প্রতিবেশী ভারতের রুপির দাম ডলারের বিপরীতে কমেছে। এমতাবস্থায় প্রতিযোগিতার কথা বলে আমাদের টাকার মানে অবমূল্যায়নের কথা উঠতে পারে। এখানে আমার বক্তব্যটা পরিষ্কার করতে চাই। টাকা ও ডলার ইস্যুতে কিন্তু একটি পক্ষ জড়িত নয়। এখানে জড়িত তিনটি পক্ষ : রফতানিকারক, আমদানিকারক ও আম জনসাধারণ। ডলারের দাম বাড়া মানে দেশের জনগণ হবে ক্ষতিগ্রস্ত। কারণ আমরা অধিকাংশ জিনিস আমদানি করে খাই-ভোগ করি। একথাটা মনে রেখে সবকিছু করা দরকার বলে মনে করি।

লেখক : সাবেক প্রফেসর বিআইবিএম।