মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১২ আশ্বিন ১৪২০
কালো পাথর ও মাকামে ইব্রাহীম
প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম
হজ ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভের অন্যতম। জীবনে অন্ততপক্ষে একবার হজ পালন করা ফরয। হজ ফরয তাঁদের জন্য যাঁদের মক্কা মুকাররমা যাওয়ার শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য আছে। হজ ও উমরাহ্র নিয়তে মক্কা মুকাররমা প্রবেশের পূর্বে ইহ্রাম বাঁধতে হয় নির্দিষ্ট স্থান থেকে। বাংলাদেশের জন্য সেই স্থান হচ্ছে ইয়ালামলাম পাহাড়। স্টিমারে গেলে ইয়ালামলাম পাহাড় এলাকায় সাইরেন বাজানো হতো ফলে তা শুনে এবং ডাইনে অদূরে উপকূলে অবস্থিত পাহাড় দেখে ইহরাম বাঁধা সম্ভব হতো। বর্তমান লেখক স্টিমারে ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে হজে গিয়েছিলেন।
প্লেনে হজে গেলে ইয়ালামলাম পৌঁছতে না পৌঁছতে প্লেনের গতির সঙ্গে সঙ্গে ইহরামের পোশাক পরিধান করাও দুরূহ হয়ে পড়ে, যে কারণে প্লেনে ওঠার আগেই ইহরাম বাঁধতে হয়।
মক্কা মুকাররমায় এসে প্রথম কর্তব্য হচ্ছে কাবা শরীফ সাতবার প্রদক্ষিণ (তওয়াফ করা), তওফাফ শেষে মাকামে ইব্রাহীম এলাকায় যেয়ে দু’রাকআত সালাত আদায় করে আবে যমযম পান করার পর সাফা-মারওয়ায় সায়ী বা সাতবার দৌড়াদৌড়ি করতে হয়।
হাজরে আসওয়াদ মানে কালো পাথর। এই পাথর থেকেই তওয়াফ করতে হয় এবং এখানেই এসে তওয়াফ সমাপ্ত হয়। এটা একটা জান্নাতী পাথর। হযরত আদম আলায়হিস সালাম ও মা হাওয়া আলায় হাস সালামকে জান্নাত থেকে পৃথিবীতে নামিয়ে দেয়া হলে তাঁরা দু’জনা দুই স্থান থেকে তওবা ইস্তিগফার করেন প্রায় সাড়ে তিন শ’ বছর ধরে। তারপর আল্লাহ তাঁদের তওবা কবুল করলে তাঁরা আরাফাত ময়দানে এসে মিলিত হন এবং এখান থেকে ৯ মাইল পূর্বে অবস্থিত বাক্কা বা মক্কায় এসে সংসার গড়ে তোলেন।
জান্নাতে থাকাকালে হযরত আদম আলায়হিস সালাম সপ্তম আসমানে ফেরেশতাদের কাবা বায়তুল মামুর দেখেছিলেন। তাই তিনি অমনি একটি কাবা ঘরের জন্য দু’আ করলে আল্লাহ তা কবুল করেন। হযরত জিবরাঈল আলায়হিস সালামের নেতৃত্বে কয়েকজন ফেরেশতা এসে যমীনে কা’বা ঘরের ভিত্তি স্থাপন করে যান। সেই ভিত্তির ওপর হযরত আদম আলায়হিস সালাম ও মা হাওয়া আলায়হাস সালাম যৌথ পরিশ্রমে ঘর তোলেন এবং ঘরের পূর্ব কোণে স্থাপন করেন জান্নাত থেকে আনা একটি সাদা পাথর। এই পাথরই পরবর্তীতে কালো পাথর বা হাজরে আসওয়াদে পরিণত হয় মানুষের পাপ চোষার কারণে। সে আর এক ইতিহাস।
হযরত নূহ আলায়হিস সালামের সময়ের মহাপ্লাবনে কা’বাঘর একটা স্তূপে পরিণত হলে হাজরে আসওয়াদ নিকটস্থ আবু কুবায়স পাহাড়ে গিয়ে পড়ে। বহু বছর পর আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস সালাম তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত ইসমাঈল আলায়হিস সালামের সহযোগিতায় কা’বা ঘর পুনর্নির্মাণ করেন এবং হাজরে আসওয়াদ যথাস্থানে স্থাপন করেন।
হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস সালাম যে পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে কা’বা ঘর গেঁথে তুলেছিলেন সেই পাথরে তাঁর পায়ের দাগ স্পষ্টভাবে পড়ে যায়। এই পদচিহ্নবিশিষ্ট পাথরের পাটাতনই মাকামে ইব্রাহীম যা সংরক্ষিত রয়েছে কা’বা ঘরের পার্শ্বে। এক সময় এই মাকামে ইব্রাহীম কা’বার পূর্ব দেয়ালের সঙ্গে প্রায় লাগোয়া ছিল। পরে তওয়াফকারীদের তওয়াফের সুবিধার্তে তা একটি দূরে স্থাপন করেন ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত ‘উমর ইবনুল খাত্তাব রাদি আল্লাহু তা’আলা ‘আন্হূ। বর্তমানে তা এক স্বর্ণবর্ণের গোলাকার খাঁচা দ্বারা সংরক্ষিত রয়েছে।
হাজরে আসওয়াদ হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লামের প্রথম ওহী প্রাপ্তির কয়েকবছর পূর্বে কুরায়শরা কা’বা ঘর সংস্কারকালে তার স্থান থেকে খুলে রাখা হয়। পরে যথাস্থানে স্থাপন করার সময় কোন্ গোত্র এই সম্মানীয় কাজটি করবে তা নিয়ে গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ বেঁধে যাবার অবস্থা সৃষ্টি হয়। এই অবস্থা নিরসনের জন্য মক্কা নগরীর বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি আবু উমাইয়া বিন আল-মুগিরা গোত্রপ্রধানদের নিয়ে পরামর্শে বসেন এবং সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়Ñ আগামীকাল সকালে যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম কা’বা চত্বরে প্রবেশ করবেন তিনি যে মীমাংসা করে দেবেন তা সবাই মেনে নেব। বিষয়টি গোপন রাখা হয়। পরদিন সকালে সর্বপ্রথম হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম কা’বা চত্বরে প্রবেশ করলেন।
তাঁকে দেখে লুকিয়ে থাকা মুরব্বিরা বের হয়ে এসে সমস্বরে বলে উঠলেন : এই তো আমাদের আল-আমীন! ইনি যা মীমাংসা করে দেবেন তা আমরা মেনে নেব। তাঁদের কাছে হাজরে আসওয়াদ বসানো নিয়ে উদ্ভূত ঘটনার কথা শুনে তিনি একটি বড় চাদর বিছিয়ে তার ওপর হাজরে আসওয়াদ নিজ মুবারক হাত দিয়ে রেখে গোত্রপ্রধানদের সেই চাদরের কোনায় ধরে তা নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যেতে বললেন। তারা উৎফুল্ল চিত্তে চাদর ধরে সেখানে নিয়ে গেলে তিনি হাজরে আসওয়াদ নিজ মুবারক হাত দিয়ে চাদরের ওপর থেকে তুলে কা’বা ঘরের নির্দিষ্ট কোণে তা স্থাপন করলেন। তখন তাঁর বয়স পঁয়ত্রিশ বছর। আল্লাহ জাল্লা শানুহু সবার অলক্ষ্যে তাঁর প্রিয় হাবীব (সা)-এর মাধ্যমে তাঁর ঘরে এই পাথর বসিয়ে এর পবিত্রতাকে সুনিশ্চিত করলেন।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম কা’বা শরীফ তওয়াফ (প্রদক্ষিণ) করার সময় এই পাথরে চুমু দিতেন, সাহাবায়ে কেরামও তাঁকে অনুসরণ করেছেন। একবার হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদি আল্লাহু তা’আলা আনহু হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করতে গিয়ে বলেছিলেন, হে পাথর! আমার নবী তোমাকে চুমু দিয়েছেন বলেই আমি তোমাকে চুমু দিচ্ছি।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদি) বর্ণনা করেন যে, কালো পাথরখানা জান্নাত থেকে এসেছিল। তখন এর রং দুধের চেয়েও সাদা ছিল, কিন্তু আদম সন্তানদের পাপরাশি একে কালো করে দেয় (বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ)।
হযরত রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, হাজরে আসওয়াদ এবং মাকাম (মাকামে ইব্রাহীম) জান্নাতের দু’খানা মূল্যবান পাথর। আল্লাহ এদের আলো নিভিয়ে দিয়েছেন। যদি এদের আলো নিভিয়ে না দিতেন তাহলে এদের আলোতে পূর্ব ও পশ্চিমের তাবত কিছু আলোকিত হয়ে যেত (আহ্মদ)।


লেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরীফ, উপদেষ্টা, ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা), সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ