মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১২ আশ্বিন ১৪২০
‘লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে’
ড. আর. এম. দেবনাথ
মতিঝিল পাড়ার ফুটপাথ দিয়ে হাঁটছি। যাব বাংলাদেশ ব্যাংকে। হাঁটার উপায় নেই। ফলের দোকান, হকারদের দোকান। তার ওপর নতুন উৎপাত মোটরসাইকেলওয়ালাদের। তারা আজকাল জ্যাম দেখলেই, কোন অসুবিধা দেখলেই ফুটপাথে চড়াও হয়। গত সপ্তাহে আমিও এদের উৎপাত দেখি মতিঝিলে। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে তবু চলছি। হঠাৎ একটা ছেলে এসে আমার সামনে হাজিরÑ ছেলে নয়, মধ্যবয়স্ক যুবক। সুন্দর পোশাক পরা, টাই পরা। সামনে দাঁড়িয়েই বলল, স্যার, আমি আপনার ছাত্র ছিলাম। এখন চাকরি করি। এই বলেই পায়ে ধরে সালাম। আমি অপ্রস্তুত অবস্থায় ভদ্রলোককে আটকানোর চেষ্টা করি, বলি কী করছেন, কী করছেন? উনি বললেন, না, স্যার, আমাকে আপনি বলবেন না, তুমি বলবেন। তাই সই। বললাম, আজকাল তো কেউ পায়ে ধরে সালাম করে না। তুমি ভাই, এটা কী করলে? ছাত্রবন্ধুটি বলল, স্যার, এটা আমার বাবার শিক্ষা। বাবা বলতেন, যার কাছ থেকে একটা অক্ষরও শিখবে তাকেই পা ছুঁয়ে সালাম করবে চিরকাল। আমি স্যার এটা মেনে চলি। বাবার শিক্ষা। আমি লা জবাব। জিজ্ঞেস করলাম, তোমার বাবা কী করেন? বাবা হাইস্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তিনি অবসরপ্রাপ্ত অবস্থায় মারা গেছেন। পারিবারিক খবর নিতে নিতে ছাত্রবন্ধুটি আমাকে বলল, স্যার, আমার অফিস এটা। এটা মানে সামনের বিল্ডিং। খুব খুশি হব যদি স্যার এক কাপ কফি খান আমার সঙ্গে। বললাম, আজ নয়, যাচ্ছি বাংলাদেশ ব্যাংকে। না পারা গেল না। শেষ পর্যন্ত তার ওখানে যেতেই হলো। সুন্দর অফিস। ব্যাংকের শাখা। কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। কর্মীরা চটপটে ধরনের, সুবেশী সবাই। অফিস দেখে আমার খুবই পছন্দ হলো। অল্প সময়ের মধ্যেই কফি এসে গেল। ব্যাংকের অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচয় হলো। অনেক কথা। কত অভিজ্ঞতা, কত সমস্যার কথা। গেল বছর ব্যাংকে ব্যাংকে আমানতের অভাব। এখন ব্যাংকে টাকার অভাব নেই। চারদিক থেকে ব্যাংকে আমানত আসছে। সবারই প্রশ্ন, স্যার এত টাকা কোত্থেকে আসছেÑবিশেষ করে আজকের দিনে যখন গেল বছর বাজারে আমানত ছিল না। আমি আমার মতো করে জবাব দেয়ার চেষ্টা করলাম। কেউ বুঝে নিল, কেউ সন্তুষ্ট হলো না। ছাত্রবন্ধুটিকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমাদের দেশ কোথায়? তার বাড়ি যশোরের দিকে। ওরা তিন ভাই, দুই বোন। দুই ভাই দুই ব্যাংকের মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তা। এক ভাই সরকারী কলেজের অধ্যাপক, তিনিই বড়। কথায় কথায় অনেক দুঃখ-বেদনার স্মৃতি তার মনে পড়ল। তা হলো আমার প্রশ্নে। আমার জিজ্ঞাস্য ছিল তার দেশের লোকেরা কেমন আছে? গ্রামাঞ্চলের অবস্থা কেমন? কখন সে সর্বশেষ গ্রামে গিয়েছিল। এসব প্রশ্ন করে যে উত্তর পেলাম তা থেকে অনেক শিক্ষার আছে। এর জন্যই ভাবলাম, আমার কলামের পাঠকদের সঙ্গে এসব অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করি। ছাত্রবন্ধুটির নাম সুহাস (ছদ্মনাম)। সুহাস বলল, তারা ছোটবেলা গ্রামে সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত পরিবার ছিল। বাবা স্কুল শিক্ষক। গ্রামে তাদের কদর ছিল। সরকারী পর্যায়ের কেউ এলে তাদের বাড়িতেই বসতেন। চা পাওয়া যেত তাদের বাড়িতেই। চেয়ার ছিল তাদের বাড়িতেই। টিনের ঘর তাদের বাড়িতেই ছিল সবচেয়ে বেশি। গ্রামের বিচার-আচার তার বাবাই করতেন। সবাই তাই মেনে নিতেন। বাড়ির সামনে ছোট একটাই ফুলের বাগান ছিল। ছিল পুকুর, মাছ সুহাসরা কিনে খেতেন কমই। কোন বড় অনুষ্ঠান না হলে পুকুরের মাছেই চলত। পাশেই ছিল বড় একটা বিল। কৈ, শিং, মাগুর ইত্যাদি মাছ সেখানে ধরা হতো। মাছের অভাব ছিল না। অতীতের, ছোটবেলার স্মৃতি রোমান্থন করতে করতে সুহাস বলল, সেদিন আর নেই স্যার। সুহাসরা এখন তাদের গ্রামে আর্থিক সম্পদ ও প্রভাবের দিক থেকে অনেক নিচে। নতুন নতুন পরিবার সেই স্থান দখল করে নিয়েছে। এদের শিক্ষা-দীক্ষা নেই। সুহাসদের বাড়িঘর মোটামুটি আগের মতোই আছে। তিন ভাই মিলে তারা মূল ঘরকে একটা দালানে পরিণত করেছে। বাকি সব ঠিক আছে। কিন্তু প্রতিবেশী একটি পরিবার শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি করছে। ওই বাড়ির যে ছেলেটি রোজগারের প্রধান পুরুষ সে ঢাকায় ব্যবসা করে। কী ব্যবসা করে সে সম্বন্ধেও তার কোন ধারণা নেই। কিন্তু ওই ভদ্রলোক প্রতিমাসে একবার দু’বার বাড়ি যায়। সারা গ্রামের লোক তার পিছে পিছে ঘোরে। সে টাকা বিলায়। এক শ’ টাকা, পাঁচ শ’ টাকা, হাজার টাকার নোটই বিতরণ করা হয়। কেউ চিকিৎসার খরচের জন্য তার কাছে আসে। চাকরি, পদোন্নতি, ট্রান্সফার ইত্যাদির জন্য আসে। ব্যবসায়ী ছেলেটি তাদের উপকার করে। মানুষ তা পছন্দ করে। ও টাকা পায় কোথায়, এত টাকা কেন বিলায় তার জবাব কেউ খোঁজে না। ভদ্রলোক বাড়ি বানাচ্ছেন, বাড়ি পাকা করছেন, পুকুর কাটছেন, এতে মাছ ছাড়ছেন, মসজিদ বানিয়ে দিচ্ছেন। এতিমখানায় সাহায্য করছেন। এরই পাশাপাশি আরেক পরিবারের অবস্থা দিন দিন ভাল হচ্ছে। ওই বাড়ির দুই ছেলে সৌদিআরবে থাকে। প্রতিমাসে ওরা টাকা পাঠায়। তারা ওই টাকায় জমি কিনে, বাড়ি পাকা করে। পুকুর কাটে, মাছ চাষ করে। পয়ঃব্যবস্থার উন্নতি করে। আরেকটু দূরে গেলে আরও দুই-তিনটি বাড়ি আছে। তাদের লোকজনও বিদেশ থেকে টাকা পাঠায়। তারাও একইভাবে সম্পদ বৃদ্ধি করছে। উল্লেখ্য, এদের কোন আনুষ্ঠানিক লেখাপড়া নেই। এটা বলেই সুহাস প্রশ্ন করল, স্যার, কেন এত লেখাপড়া করলাম। লেখাপড়া করাটাই ভুল হয়েছে। বাবা-মা আমাদের বলতেন লেখাপড়া শেখ। লেখাপড়াই তোমাদের বাঁচতে শেখাবে। গুরুজনরা বলতেন, ‘লেখাপড়া করে যে গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে’। সুহাস বলল, স্যার, এসব কথা আমরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতাম। এ কারণেই শত বাধা-বিপত্তির মধ্যেও আমরা লেখাপড়া করেছিলাম। চলে ফিরে আছি। কিন্তু ভাল আছি বলা যাবে না। আমরা তিন ভাই মোটামুটি ভাল আছি। কিন্তু যারা লেখাপড়া জানে না, তাদের সহায়-সম্পত্তি হচ্ছে বেশি হারে। যারা বিদেশে গেছে তাদের সম্পদ বাড়ছে। যারা ব্যবসা করছে তাদের সম্পদ বাড়ছে। যারা রাজনৈতিক কর্মী তারা সম্পদ করে নিচ্ছে। শিক্ষিত অথচ সততার সঙ্গে যারা চাকরি-বাকরি করে তারা সম্পদের দিক থেকে পেছনে পড়ে যাচ্ছে। গ্রামে বাড়িঘর করছে, জমি কিনছে জীবনযাত্রার মান উন্নত করছে যারা বিদেশে যেতে পেরেছে। অর্থাৎ যারা রেমিট্যান্স পাঠায় তারা ভাল আছে। অথচ একজন শিক্ষিত চাকরিজীবী যিনি সৎ তার পক্ষে শহরে কেন গ্রামেও বাড়িঘর করা সম্ভব নয়। গ্রামের জমির দাম এখন খুবই উঁচুতে। সাধারণভাবে জমি কেনা সম্ভব নয়। ঢাকা শহরে যারা চাকরি করে, এমন কী ছোট চাকরি করে, তাদেরও সম্পদ হচ্ছে। এদের অনেকের আয়ের উৎস কী তা কেউ জানে না।
সুহাসের প্রশ্ন, ‘লেখাপড়া করে কী লাভ হলো? এই প্রশ্নের জবাব আমার জানা নেই। তবে বোঝা যাচ্ছে যারা লেখাপড়া করেছে, দেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জন করেছে, যারা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পাচ্ছে তাদের মধ্যে যারা সৎভাবে জীবনযাপন করতে চায় তাদের হতাশা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কি সরকারী খাত কি বেসরকারী খাত যেখানেই শিক্ষিত লোকেরা চাকরি করে সৎভাবে তারা সম্পদের দৃষ্টিকোণ থেকে পেছনে পড়ে যাচ্ছে। ছেলেমেয়ের শিক্ষা-দীক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন ইত্যাদি সুযোগ সুবিধার দৃষ্টিকোণ থেকেও তারা প্রতিযোগিতায় হেরে যাচ্ছে। তুলনামূলকভাবে যারা অশিক্ষিত, যারা ব্যবসা করে তাদের সম্পদ বাড়ছে। ছোটবেলায় আমরা দেখেছি, যারা চাকরি করত তারাই সুন্দর ঘরবাড়ি বানাত, তারাই সচ্ছল জীবনযাপন করত, তারাই সংস্কৃতিবান জীবনযাপন করত। গ্রামের সমাজে তারাই ছিলেন আদর্শপুরুষ। গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাদীক্ষা, সংস্কৃতি চর্চা, খেলাধুলায় তারা অবদান রাখছেন। স্বজাত্যবোধ, উদারতা চর্চা ইত্যাদিতে তারা ছিলেন অগ্রগণ্য। কিন্তু আজকাল দেখা যাচ্ছে গ্রামের চিত্র ভিন্ন। যারা অর্থকড়ি বানাচ্ছেন তাদের মধ্যে এক ধরনের উগ্র ধার্মিকতা দেখা যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে যারা টাকা পাঠায় তারা গ্রামে এসে সংস্কৃতি চর্চা, খেলাধুলার ব্যবস্থা করবে দূরের কথা, উল্টো তারা বরং গ্রামাঞ্চলে রক্ষণশীলতা চর্চার দিকে বেশি মনোযোগী হচ্ছে। এমন গ্রামও আছে যেখানে খেলার মাঠ আছে, কিন্তু ফুটবল খেলার কোন অনুমতি নেই। ফুটবল খেলতে হাফপ্যান্ট পরতে হয়। একে বলা হচ্ছে অধার্মিক কাজ। এরা জমিজমার দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। এমন কি প্রতিযোগিতা করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। একটা লাইব্রেরি করা, সমবায় ভিত্তিতে কাজ করার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি এখন নেই। ওই সব বাড়ির অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভোগ আছে, সংস্কৃতি নেই। লেখাপড়া বলতে স্কুল, কলেজ হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু উদার পরিবেশ হারিয়ে যাচ্ছে। আগে একজন শিক্ষক, একজন সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী যেখানে সমাজকে নেতৃত্ব দিত, সেখানে নেতৃত্ব চলে গেছে ব্যবসায়ীর হাতে, যার টাকা আছে। তিনি হতে পারেন ঢাকার ব্যবসায়ী, মফস্বলের ব্যবসায়ী। ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত, বিচার-আচার চলে গেছে ব্যবসায়ী কাম রাজনীতিবিদদের হাতে। ক্ষমতা চলে গেছে ‘শিক্ষার’ হাত থেকে টাকার হাতে। এটা দেশেরও চিত্র। আগে সংসদে যেত পেশাধারীরা, ছোটখাটো বৃত্তিজীবীরা, উকিল-মোক্তার, ডাক্তার, শিক্ষকবৃন্দ। আজকের সংসদের ৮০ শতাংশই ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীরাই রাজনীতিবিদ, রাজনীতিবিদরাই ব্যবসায়ী। রাজনীতি করতে করতে লোকে ব্যবসায়ী হচ্ছে, ব্যবসা করতে করতে ব্যবসায়ী হচ্ছে। ক্ষমতা চলে গেছে বৈশ্যের (ব্যবসায়ী) হাতে। বৈশ্যের লোভ, অতিলোভ হচ্ছে ধর্ম। প্রফিট, মুনাফা, টাকা তার উপাস্য। এর কাছে আর কিছু বিবেচ্য নয়। গ্রামেও তাই ঘটছে। সেখানেও টাকার কাছে গুণ পরাস্ত হচ্ছে। লক্ষ্মীর (টাকা-পয়সা) কাছে সরস্বতী (জ্ঞান) হেরে যাচ্ছে। গ্রাম বদলে যাচ্ছে। এ কারণেই সর্বত্র আপসোসÑলেখাপড়া করে কী হবে। লেখাপড়া করে চাকরি পেয়ে যদি অসৎ জীবনযাপন না করা যায় তাহলে এই লেখাপড়ায় ধন সম্পদ তো দূরের কথা সাধারণ জীবনযাপনও সম্ভব নয়। এখন ‘লেখাপড়া করে যে গাড়িচাপা পড়ে সে’ এটাই সত্য। তাই নয় কী?