মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ২০ মে ২০১৩, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০
২০ মে চুকনগর গণহত্যা দিবস
মোঃ মুজিবুর রহমান
আজ ২০ মে। চুকনগর গণহত্যা দিবস। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এই দিনে খুলনা জেলার পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত চুকনগরে ঘটে যায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বর্বরতম এক গণহত্যা। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের বেদনাবহ গণহত্যার স্মৃতিবিজড়িত স্থান হয়ে রয়েছে চুকনগর। চুকনগর খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার অন্তর্গত। এই উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নে চুকনগর অবস্থিত। খুলনা জেলার ডুমুরিয়া থানার অন্তর্গত চুকনগর একটি ছোট্ট ব্যবসাকেন্দ্রিক এলাকা তথা বাজার। এলাকাটি সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যস্ততা লেগেই থাকত। এছাড়া এলাকাটি ছিল কর্মমুখর। চুকনগর খুলনা শহর থেকে ৩২ কি.মি. পশ্চিমে ভদ্রা নদীর তীরে অবস্থিত। ১৯৭১ সালের এ দিনটিতে স্থানীয় রাজাকার ও শান্তি কমিটির সহায়তায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী চুকনগরে আক্রমণ চালায়। তারা নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে হাজার হাজার নারী-পুরুষ-শিশু হত্যা করে। বাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং লুটতরাজ চালানো হয়। আমাদের স্বাধীনতা আমাদের প্রিয় মানুষের রক্তে কেনা অমূল্য সম্পদ। পাকিস্তানী বাহিনী কর্র্তৃক পরিচালিত প্রতিটি গণহত্যার লক্ষ্য ছিল এই অমূল্য সম্পদকে ধ্বংস করা ও বাঙালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দমন করা। সেই সঙ্গে পাকিস্তানী বাহিনী তাদের বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য গণহত্যার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। গণহত্যা শুরু হয় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ এবং এ গণহত্যা দেশের সর্বত্র চলেছে মুক্তিযুদ্ধের পুরো ৯টি মাস। বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, তখনও ঢাকাসহ কয়েকটি জেলায় গণহত্যা চলে। হানাদার পাকিস্তান বাহিনী সারাদেশে গণহত্যা শুরু করলে তার প্রভাব এসে পড়ে খুলনাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায়। সারাদেশে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তিকমিটির লোকেরা মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধ করেছে। দেশের গণহত্যার জঘন্য নজির স্থাপিত হয় মে মাসের ২০ তারিখে চুকনগরে। কেউ কিছু অনুধাবন করার আগেই গর্জে ওঠে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর অস্ত্র। গুলি আর গুলি। তা যেন বৃষ্টির মতো। পাখির মতো মরতে থাকে মানুষ। দুই থেকে তিন ঘণ্টা স্থায়ী হয় পাকিস্তানী বাহিনীর তা-বলীলা। পাশে ভদ্রা নদী। লাশে ভরপুর। শহীদদের তাজা রক্তে লাল হয়ে যায় এ নদীর পানি।
খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরিশাল, গোপালগঞ্জ থেকে হাজার হাজার বাঙালী নৌপথে ও হেঁটে আসতে থাকে চুকনগরে। এ আসা নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ইতোমধ্যে অনেক বাঙালী সীমান্তের ওপার ভারতে চলে গেছেন। ২০ মে ১৯৭১। চুকনগরে বিভিন্ন জেলা থেকে আগত বাঙালীরা অপেক্ষা করতে থাকে ভারতে পাড়ি দেয়ার জন্য। প্রতিদিনের মতো আগের দিন চুকনগরে আগত বাঙলীরা আশ্রয় গ্রহণ করে ওই এলাকার স্কুল ঘরে, বাজারে, পাশে পোতোখোলা বিলের ধারসহ বিভিন্ন স্থানে। এই পলায়ন শুধমাত্র জীবন বাঁচানোর জন্যই নয়। অনেকের লক্ষ্য ভারতে গিয়ে স্বদেশ- ভূমিকে দখলদার পাকিস্তানী বাহিনী থেকে মুক্ত করার জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশ্রগ্রহণের জন্য নাম লেখানো। ২০ মে সকাল বেলায় প্রত্যেকেই ভারতের উদ্দেশে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যে সকাল ১০টার দিকে সাতক্ষীরা থেকে পাকিস্তানী বাহিনীর দুই/তিনটি গাড়ি এসে থামে পোতোখোলা বিলের পাশে। স্থানীয় রাজাকার, আলবদর ও অবাঙালীদের (বিহারী) সহায়তায় পাকিস্তানী বাহিনী শুরু করে হত্যাযজ্ঞ। পাকিস্তানী সৈন্যের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না, সম্ভবত এক প্লাটুন। ট্রাক থেকে নেমে হানাদার পাকিস্তানী বাহিনী এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকে। কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি কর্মমুখর ও ব্যস্ত এলাকা পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। শুধু লাশ আর লাশÑ চারদিকে লাশের স্তূপ। মৃত শিশু মৃত মায়ের কোলে, বাবার কোলে। স্ত্রী তাঁর স্বামীর কোলেÑএ রকম চিত্র সেদিনের হত্যাযজ্ঞে দেখতে পাওয়া যায়। এই গণহত্যার পাশাপাশি বর্বর পাকিস্তানী বাহিনী যুবতী নারীদের ধর্ষণ করে। এছাড়াও অনেক বাঙালীকে নিকটবর্তী পাকিস্তানী বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে পরে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। আবার যারা আহত হয়েছিল তাদেরকে বর্বর হানাদাররা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। ভদ্রা নদীতে লাশ ফেলার দায়িত্ব দেয়া হয় অনেককে। প্রতি লাশের জন্য ৫০ পয়সা প্রদান করা হবেÑএ ধরনের ঘোষণা দেয়া হয়। লাশের গায়ে যেসব সোনা-গয়না ও নগদ অর্থ যা পেয়েছে তার কারণে গুণে গুণে লাশ ফেলানোর গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে লাশ ফেলানোয় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ। এই ব্যক্তিবর্গের মধ্যে এখানও জীবিত রয়েছে কেউ কেউ। তাদের মতে, যত লাশ প্রথমদিকে গুণে রাখা হয়েছিল তার চেয়ে বেশি লাশ ভদ্রা নদীতে ফেলা হয়। বর্বর হানাদার বাহিনী চুকনগর থেকে চলে যাওয়ার পর সেখানে ছিল চিল-শকুনের দল। চুকনগরে গণহত্যায় কত বাঙালী শহীদ হয়েছিল তার প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে। সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা না গেলেও চুকনগরে ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
চুকনগরে শহীদদের উদ্দেশে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছে যা চুকনগর শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নামে পরিচিত। ২০ মে’র গণহত্যার বিবরণের স্বার্থে চুকনগরে গড়ে তোলা দরকার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কমপ্লেক্স। বর্তমান ও ভবিয্যত প্রজন্মকে গণহত্যার বিষয়ে সচেতন করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ করতে হবে। সেই সঙ্গে এ গণহত্যা বিষয়ে তাদেরকে বিস্তারিত জানাতে হবে। এজন্য দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে আমাদের সকলকে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বিভাগীয় প্রধান, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, কাজী আজিমউদ্দিন কলেজ, গাজীপুর এবং আর্কাইভস ’৭১-এর প্রতিষ্ঠাতা