মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ৯ মে ২০১৩, ২৬ বৈশাখ ১৪২০
গণতান্ত্রিক সরকারই সব থেকে শক্তিশালী সরকার- এটাই প্রতিষ্ঠিত করুন
স্বদেশ রায়
বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় সামরিক কালচারের ভেতর দিয়ে বেড়ে উঠেছে। প্রকৃত গণতন্ত্র তাই এখন এ দেশের মানুষের কাছে পরিচিত নয়। যে কারণে, এ দেশের এক শ্রেণীর মানুষ মনে করেন সামরিক সরকারই সব থেকে শক্তিশালী সরকার। কিন্তু প্রকৃত অর্থে সেটা কখনই নয়। বরং যত দুর্বলতম সরকার আছে সামরিক সরকার তার মধ্যে একটি। একটি দেশে সব থেকে শক্তিশালী সরকার হচ্ছে গণতান্ত্রিক সরকার। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার অর্থাৎ যার ভিত্তি জনগণ তার থেকে শক্তিশালী কোন সরকার আর হতে পারে না। যে কারণে কোন দেশে প্রকৃত গণতান্ত্রিক সরকার থাকলে ওই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নও যেমন বেশি হয় তেমনি জনকল্যাণ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে বেশি।
গণতান্ত্রিক সরকারের যেহেতু জবাবদিহিতা বেশি সেজন্য তার সহনশীলতা ও স্বচ্ছতাও বেশি। তবে সহনশীলতা ও স্বচ্ছতার মানে এই নয় যে, একটি সরকারকে নতজানু হতে হবে। গণতন্ত্র মানেও এই নয় যে, দেশের ভেতর যে কেউ যা খুশি করতে পারবে। গণতন্ত্রে মত প্রকাশসহ সব ধরনের স্বাধীনতা সবাইকে দেয়া হয়েছে, তবে সেটা সম্পর্কে সংবিধানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে আইনের দ্বারা বিধিবদ্ধ বা আইনের অধীনে থেকে এ সকল স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হলো।
গত দুই মাসের বেশি সময় ধরে জামায়াত ও বিএনপির উস্কানিতে হেফাজতে ইসলাম নামক একটি সংগঠন ও আমার দেশ নামক একটি পত্রিকা ও দিগন্ত টেলিভিশন নামক একটি টেলিভিশন যে কাজগুলো করছিল তার কোনটাই আইনের দ্বারা বিধিবদ্ধ সীমানার ভেতর ছিল না। মূলত তারা কেউই বাংলাদেশের আইন ও সংবিধান মানছিল না। হেফাজত তো এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, তারা এক পর্যায়ে আমাদের সংবিধানের মূল চেতনা সংশোধন বা বদল করার দাবি জানায়। হেফাজতের নেতারা অধিকাংশ ৭১-এর রাজাকার ও আলবদর। তাদের সমর্থকরা রাজকার ও আলবদরদের সন্তান। এবং তাদের পিতার সেই চেতনা তারাও ধারণ করে। তাই স্বাভাবিক তাদের কাছে বাংলাদেশের সংবিধানের কোন মূল্য নেই। কিন্তু বাংলাদেশের সরকারে যাঁরা আছেন, যাঁরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। এই সরকার ও জনগণ জানে বাংলাদেশের সংবিধানের মূল চেতনা মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা থেকে উৎসারিত। আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা আমাদের সংবিধানের জেনাস বা মাতৃকোষ। এটার পরিবর্তনের ক্ষমতা কারও নেই। ত্রিশ লাখ শহীদ ও সাড়ে ছয় লাখ মা-বোনের আব্রুর বিনিময়ে পাওয়া। কতকগুলো রাজাকার, আলবদর আর রাজাকার আলবদরের সন্তান বলবেই আর সংবিধান বদলাতে হবে? এরা কি সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের রায়টিও পড়ে দেখেনি। এটা বোঝার জ্ঞানও ওদের নেই। কতকগুলো সন্ত্রাসী মিলে জামায়াত-বিএনপির টাকা খেয়ে এ কাজ করছিল। কিন্তু দেশের মানুষ শঙ্কিত হয়ে পড়েছিল সরকারের নমনীয়তা দেখে।
শেষ অবধি সরকার প্রমাণ করেছে তাদের নমনীয়তা মানে দুর্বলতা নয়। সরকার প্রমাণ করেছে গণতান্ত্রিক সরকার মানে সব থেকে শক্তিশালী সরকার। শুধু তাই নয়, সরকার এটাও প্রমাণ করেছে তার দলকে অর্থাৎ যে রাজনৈতিক দলকে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ভোট দিয়েছে ওই দলটিও শক্তিশালী। হেফাজতের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেবার আগে সরকারী দলের মহাসচিব সংবাদ সম্মেলন করে হেফাজকে যে নির্দেশ দিয়েছিল সেটাও ছিল যথার্থ। অর্থাৎ একটি দলকে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ভোট দিয়েছে তাই নিঃসন্দেহে রাজনৈতিকভাবে ওই দলটি সব থেকে শক্তিশালী। তাছাড়া গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব অনেক। দেশকে তথাকথিত কয়েক লাখ মানুষ একটি বিশৃঙ্খলার পথে নিয়ে যাবে আর ওই দলটি বসে বসে আঙ্গুল চুষবে সেটা তো হতে পারে না। তাই দলের মহাসচিব হিসেবে, সরকারের একজন মন্ত্রী হিসেবে সেদিন সৈয়দ আশরাফ তাঁর পাশে প্রেসিডিয়ামের অন্যতম মেম্বার আবদুল লতিফ সিদ্দিকী ও শেখ সেলিমকে রেখে ঠাণ্ডা মাথায় যে নির্দেশ ওই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে দিয়েছিলেন তা ছিল সত্যিই একটি জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়া দলের নেতার মতো। জনগণ তাঁর কথায় শুধু আশ্বস্ত হয়নি, ভবিষ্যত দিকনির্দেশনাও পেয়েছে। এরপরে সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছেন এর মাধ্যমে তিনি শুধু দেশকে একটি সঙ্কট থেকে মুক্ত করেননি। তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকার ও রাজনীতির কালচারকে অনেক উর্ধে তুলে ধরেছেন। তিনি দেশের মানুষের একটি ভুল শোধরানোর পথ করে দিয়েছেন যে, কোন অগণতান্ত্রিক সরকারের থেকে গণতান্ত্রিক সরকার অনেক বেশি শক্তিশালী এবং গণতন্ত্রে নৈরাজ্যের কোন স্থান নেই। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য এটা একটি শুভযাত্রা এবং দেশের মানুষও এটা চায়। আইনের শাসন বলতে এটাকেই বোঝায়।
গণতন্ত্রে মত প্রকাশ, সভা-সমিতি করার অধিকার আছে। তবে সেটা আইনের ভেতর থেকে। সভা-সমিতির নামে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট করবে। এটা কোন গণতন্ত্রের নামে সহ্য করার কোন সুযোগ নেই। বরং সরকারকে আরও দৃঢ়ভাবে অবিলম্বে বুঝিয়ে দিতে হবে যে, গণতন্ত্রে এই নৈরাজ্য সৃষ্টির কোন সুযোগ নেই। তাই শুধু যে হেফাজতকে ঢাকা থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে এখানেই শেষ করলে চলবে না। ওইদিন রাজধানীতে কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে অগ্নিসংযোগ করে দেশের কোটি কোটি ধর্ম বিশ্বাসী মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা হয়েছে এবং দেড় হাজারের বেশি পরিবারকে নিঃস্ব করা হয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া, পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ প্রকাশ্যে পোড়ানোর অপরাধ কী সেটা দেশের প্রচলিত আইনে আছে। যাদের নির্দেশে এ কাজগুলো হয়েছে এবং যে নেত্রী এই কাজে সহযোগিতা করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। যিনি প্রেস কনফারেন্স করে এ কাজে সহায়তা করতে বলেছেন। অবিলম্বে তাদের সকলকে ওই আইনের আওতায় এনে বিচার শুরু করতে হবে। সরকার খোঁজ নিলে জানতে পারবে এটা দেশের সকল ধর্ম প্রাণ মানুষের দাবি। শুধু মানুষের দাবি নয়। রাষ্ট্রে এ ধরনের অপরাধ যারা করে ও করতে সহায়তা করে তাদের বিচারের আওতায় আনা সরকারের অবশ্য কর্তব্য। সরকারকে এটা করতে হবে। পাশাপাশি বিচার বিভাগের মাধ্যমে হোক আর নির্বাহী বিভাগের মাধ্যমে হোক যাদের নির্দেশে ও যাদের সহায়তায় দেড় হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সর্বস্ব হারিয়েছে অবিলম্বে ওই নির্দেশদাতাদের অর্থাৎ ওই সংগঠনের নেতাদের ও যে সব সংগঠন তাদের সহায়তা জানিয়েছিল সেই সব সংগঠনের নেতাদের সম্পত্তি জব্দ করে ওই অর্থ দিয়ে এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশে প্রচলিত একটি আইন আছে। যতদূর জানি আইনটি খুব শক্তিশালী নয়। সরকারের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। সরকারের কাছে অনুরোধ করব, গণতন্ত্রের স্বার্থে ওই আইন সংশোধন করুন এবং যারা এই দেড় হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে নিঃস্ব করেছে, ওই সংগঠনগুলোর নেতাদের আইনের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করুন। বিচার বিভাগ যদি স্বপ্রণোদিত হয়েও এখানে কিছু করতে পারে সেটাও যেন তারা করে। কারণ, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে, দেশের উন্নতি করতে হলে আইনের মাধমে এই কঠোরতার দৃষ্টান্তগুলো স্থাপন করার এখনই সময়। একবার শুধু হেফাজতের প্রতি আইনগত ব্যবস্থা নেবার ফলে যেমন দেশের অবস্থা বদলে গেছে ঠিক তেমনি একবার শুধু আইনগতভাবে এই ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হোক, দেখা যাবে দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ কত শক্তিশালী হয়েছে। নৈরাজ্য কতটা কমতে শুরু করেছে এবং এই দেড় হাজার ব্যবসায়ীর স্বার্থে সরকারকে এটা করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর দেশের মানুষের এভাবে সম্পদ নষ্ট করতে না পারে। তাছাড়া এই সব সংগঠন দেশের মানুষের সম্পদ নষ্ট করবে আর সরকার ক্ষতি পূরণ দেবে এটা তো সন্ত্রাসীদের জন্য মামুবাড়ি হয়ে গেল। হ্যাঁ, সরকার সাময়িক সাহায্য তাদের দেবেই। তবে তাকে যে কোন মূল্যে এই ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে এবং তখন যেটা সরকার সাহায্য হিসেবে দিয়েছিল সেটা আবার ওদের সম্পদ থেকে কেটে নিয়ে সরকারের কোষাগারে জমা হবে। এই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প নেই।
এবং এটা শুধু মাত্র এই দেড় হাজার ব্যবসায়ীর জন্য নয়, গত কয়েক মাসের তথাকথিত আন্দোলনের নামে যারা এই কাজ করেছে ওই সব দলের ও নেতাদের সম্পদ জব্দ করে এই ক্ষতিপূরণ দেবার ব্যবস্থা করতে হবে। হরতাল ডাকা যেমন কারও অধিকার তেমনি হরতালের দিনে গাড়ি চালানোও আবার অধিকার। তাই কেউ যদি হরতালের নামে কারও গাড়ি ভাঙ্গে তাহলে অবশ্যই যে সংগঠন ওই দিন হরতাল ডেকেছিল তাকে এর ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং প্রচলিত আইনে যদি এটা পুরোপুরি সম্ভব না হয় তাহলে সে ক্ষেত্রেও গণতন্ত্রের স্বার্থে সরকারকে অবিলম্বে আইন সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরকার যদি মনে করে ভবিষ্যতে কখনও আমরা বিরোধী দলে যেতে পারি তখন আমাদের হরতাল ডাকতে হতে পারে তাই আমরা নিশ্চুপ থাকি। তাহলে সরকার কিন্তু ভুল করবে। যেমন ভুল তারা হেফাজতের প্রতি প্রথমের দিকে নমনীয় হয়ে করেছে। কারণ, বাংলাদেশের বাস্তবতায় ভবিষ্যতে আর গাড়ি ভেঙ্গে, মানুষ মেরে হরতাল করা যাবে না। তাতে জনসমর্থন মিলবে না বরং কমবে। কারণ, বাংলাদেশে ভবিষ্যতে কারা আসছে সেটা সরকার গণজাগরণ মঞ্চের তরুণ-তরুণীদের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবে। এরাই আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম। এদের ভাষাই আমাদের ভবিষ্যতের ভাষা। এদের আচরণই আমাদের ভবিষ্যতের আচরণ। তাই বর্তমানের এই রাজনীতির নামে সন্ত্রাসকে কেউই এ দেশে আর ভবিষ্যতে টেনে নিতে পারবে না। গত চার বছর সন্ত্রাস করতে করতে বেগম জিয়া এখন সন্ত্রাসী সংগঠন জামায়াতের আমির ও অপর সন্ত্রাসী সংগঠন হেফাজতের হেফাজতকারিণী হয়েছেন। এবং যাঁরা সন্ত্রাসের মাধ্যমে রাজনীতি করতে চান তাঁদের ভবিষ্যত বাংলাদেশে এর বেশি কিছু নয়। তাই হরতালের নামে যে সন্ত্রাস জামায়াত ও বিএনপি চালাচ্ছে এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়া ছাড়া অন্য কোন বিকল্প হাতে নেই। হরতালের নামে এখন রেললাইন ওপড়ানো হচ্ছে, ট্রেনের বগিতে আগুন দেয়া হচ্ছে, যাত্রীবাহী বাসে, প্রাইভেট গাড়িতে, সিএনজিতে আগুন দেয়া হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে এখন কঠোর হওয়া ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই। একমাত্র গণতান্ত্রিক সরকারই যে আইনের মধ্যে থেকে এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে সেটা এখনই প্রমাণ করার সময়। এ নিয়ে সময়ক্ষেপণের কোন সময় আর নেই। আমাদের প্রচলিত আইনে গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা, গাড়ি ভাংচুর করা, রেলের বগিতে আগুন দেয়া, রেললাইন ওপড়ানো এ ধরনের কাজে লিপ্ত সন্ত্রাসীকে দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দেয়ার সুযোগ আছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একবার বলেছিলেন, প্রয়োজন হলে তারা সে ব্যবস্থা নেবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ করব, আপনি নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন, এ পর্যন্ত হরতালের নামে যত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে ও গাড়ি ভাঙ্গাসহ রাষ্ট্রের ও জনগণের যত সম্পদ নষ্ট করা হয়েছে এর পরে এই নির্দেশ না দেয়া নিয়ে কালক্ষেপণের আর কোন সুযোগ নেই। হেফাজত যেমন দশ মিনিটে পালিয়েছে, একবার গুলির নির্দেশ চালু করুন দেখবেন, গাড়ি ভাঙ্গা বন্ধ হয়ে গেছে দশ মিনিটেই।
পাশাপাশি যারা গাড়ি ভেঙ্গেছে, গত কয়েক হরতালে গাড়িতে আগুন দিয়েছে তাদের অনেককেই টিভিতে দেখা যায়। পুলিশ ও র‌্যাবকে বলুন দেখবেন এদের ফুটেজ নিয়ে মুহূর্তে তারা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে। কারণ, র‌্যাব যেভাবে ২৪ ঘণ্টার ভেতর রানা প্লাজার রানাকে গ্রেফতার করেছে। তাতে এদের ধরতে তাদের ২৪ মিনিট লাগবে না।
এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন, আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী তাঁর সাম্প্রতিক কলামে লিখেছেন, সম্প্রতি যে সমস্ত পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি সদস্য নিহত বা আহত হয়েছেন সরকার যেন তাঁদের জাতীয় বীর হিসেবে ঘোষণা করে। শ্রদ্ধেয় গাফ্ফার চৌধুরীর এই বক্তব্যকে এখন বাংলাদেশের ষোলো কোটি মানুষ সমর্থন করে। কারণ, এই যে সব পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি সদস্য নিহত ও আহত হয়েছেন এঁরা আমাদের গণতন্ত্র রক্ষার শ্রেষ্ঠ সৈনিক। তাই এদের অনতি বিলম্বে জাতীয় বীর ঘোষণা করে গণতন্ত্রের সৈনিক পদক দেয়া হোক। এবং তাঁদের পরিবারের প্রতি সেই সাহায্যের ব্যবস্থা করা হোক যাতে তাঁদের পরিবার কখনও উপলব্ধি করতে না পারে তারা তাদের উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়েছে। আজকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ইতিহাস অনেক অপাঙক্তেয় অনেকের কাছে। তবে এটা চিরকাল সবাইকে মানতে হবে, যারা সেদিন ওই বিপ্লবের সৈনিক ছিলেন তাঁদের প্রাণ উৎসর্গ ও তাদের চেতনাকে সম্মান করবে পৃথিবীর মানুষ চিরকাল। এমনি এক সমাজতন্ত্রের সৈনিক বুলগেরিয়ায় বিপ্লবের সময় তার সন্তানকে চিঠি লিখেছিল, প্রিয় সন্তান, তুমি এখনও তোমার মায়ের পেটে। তুমি হয়ত ভূমিষ্ঠ হয়ে দেখবে তোমার পিতা বেঁচে নেই। কিন্তু তুমি দেখতে পাবে তোমার পিতা এমন এক রাষ্ট্র উপহার দিয়ে গেছেন যে রাষ্ট্র তোমার পিতার দায়িত্ব পালন করছে। আজ জামায়াত, বিএনপি, হেফাজতী এই সন্ত্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই করছে। তাই রাষ্ট্রকে অবশ্যই এ নিশ্চয়তা দিতে হবে তাদের কেউ যদি প্রাণ হারায় তাহলে তাদের পরিবারের সন্তানরা উপলব্ধি করতে পারে রাষ্ট্র তাদের পিতার দায়িত্ব পালন করছে। এ প্রসঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলব, সম্প্রতি দৈনিক জনকণ্ঠে দুটি রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে সেখানে দেখা গেছে, জামায়াত-শিবিরের হাতে আহত হয়ে পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। কিন্তু তাঁদের পরিবারগুলো খুবই উদ্বিগ্ন তাঁদের চিকিৎসা খরচ ও ভবিষ্যত নিয়ে। আশা করব, প্রধানমন্ত্রী অবিলম্বে নিজ উদ্যোগে ওই পরিবারগুলোর উদ্বেগ থেকে মুক্তি দেবেন। তাদের ভবিষ্যতকে নিশ্চিত করবেন এবং পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটি সুস্থ থাকলে বা বেঁচে থাকলে পরিবার যে নিশ্চয়তা পায় তারা যেন সেই নিশ্চয়তা পায়।
হেফাজতের পাশাপাশি গত দুই মাস ধরে দেশের ভেতর অশুভ শক্তি সৃষ্টি করতে ও মানুষকে বিভ্রান্ত করতে আমার দেশ পত্রিকা ও দিগন্ত টেলিভিশন যে ভূমিকা রেখেছে সেটা কোনমতেই মত প্রকাশের স্বাধীনতার সংজ্ঞায় পড়ে না। সরকার সংবাদপত্র, টেলিভিশন বা রেডিওসহ যে কোন মিডিয়ার ওপর কোনরূপ হস্তক্ষেপ করুক এটা গণতান্ত্রিক সমাজে কেউ চায় না। একজন সাংবাদিক হিসেবে এর সমর্থন করার কোন প্রশ্ন ওঠে না। এমনকি বর্তমানে সোস্যাল মিডিয়ার জন্ম হয়েছে এটার ওপরও সরকারের কোন খবরদারি থাকুক এটাও সমর্থনযোগ্য নয়। তবে আমরা যারা মিডিয়া পরিচালনা করি বা মিডিয়ায় কাজ করি, আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা একটি দেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইনের আওতার ভেতরের একটি মানুষ। দেশের প্রতিটি নাগরিককে তার নিজ নিজ কাজ যেমন সংবিধান ও প্রচলিত আইনের আওতার ভেতর থেকে করতে হয়, মিডিয়া পরিচালনাও ঠিক তেমনি।
সংবাদপত্রের বা মিডিয়ার স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়, মিথ্যা প্রকাশ ও প্রচার নয়। সংবিধান লঙ্ঘন নয়। দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি হয় এমন কোন কাজ নয়। মিথ্যা প্রচার, ধর্মীয় উস্কানি, দেশের ভেতর অস্থিরতা সৃষ্টি, কাউকে হত্যার উস্কানি সৃষ্টি, দেশের বিচার বিভাগের ক্ষতি সাধন, দেশের সার্বভৌমত্ব ও মৌলিকত্বের বিরোধিতা এ সবের কোনটাই আমাদের সংবিধান অনুযায়ী মত প্রকাশের স্বাধীনতার ভেতর পড়ে না। আমাদের সংবিধানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে আইনের অধীনে থেকে যে কোন নাগরিক নিশ্চিতভাবে মত প্রকাশ করতে পারবে। বরং এগুলো সবই সংবিধান বিরুদ্ধ এবং দেশের প্রচলিত আইন বিরুদ্ধ। তাই এ কাজ যেই করুন না কেন, তিনি সংবাদপত্রের সম্পাদক হোন আর টিভির পরিচালক হোন তাঁকে অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে।
আমার দেশ ও দিগন্ত টেলিভিশন ও নয়া দিগন্ত পত্রিকা এই কাজ শুরু করেছে অনেক দিন। গণজাগরণ মঞ্চ তৈরি হলে দেশের সচেতন তরুণ সমাজ এগুলো সরকারের দৃষ্টিতে আনে এবং এর বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলে। এমনকি আমার দেশ, দিগন্ত টিভি ও নয়া দিগন্তের উস্কানিতে যখন প্রজন্ম সেনা হত্যা হলো একের পর এক। এমনকি যারা গণজাগরণ মঞ্চ করছে তাদের সন্তান অবধি হত্যা করা হলো (যদিও নারায়ণগঞ্জের ত্বকী হত্যাকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জের মেয়র তাঁর নিজস্ব রাজনীতি বাঁচানোর স্বার্থে এই দুঃসময়ে দেশের শত্রুদের আড়াল করে ভিন্ন রাজনীতিতে নেমেছেন। দেশের গণতন্ত্রের স্বার্থে শেখ হাসিনাকে এ বিষয়ে অবিলম্বে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ, আওয়ামী লীগে থাকলে সবাই অনেক বড়, আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে গেলে ৪০০ ভোটের মালিক হবে। তাই যারা জামায়াতকে রক্ষা করছে তাদের বিরুদ্ধে দলকে সিদ্ধান্ত নিতেই হবে) তার পরেও এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। আমার দেশের সম্পাদককে গ্রেফতার করেছে। দিগন্ত টিভি বন্ধ করেছে। এখন এই প্রক্রিয়াকে আরো কঠোরতার সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, তদন্ত কমিটি হবে। অবিলম্বে তদন্ত কমিটি করে এদের যাবতীয় কাজের রেকর্ড (যেহেতু টিভি ফুটেজ ও পত্রিকায় প্রকাশিত ম্যাটার আছে) পর্যালোচনা করে এরা সংবিধান, রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনের বিরুদ্ধে কী কী কাজ করেছে সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে এবং সেগুলো যথাযথ বিচারের আওতায় আনতে হবে। আমার দেশ ও দিগন্ত যা করেছে এগুলো অন্য কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে করা সম্ভব কিনা সরকার একবার ভেবে দেখলে বা খোঁজ নিলে বুঝতে পারবে। ব্রিটেনের গণতন্ত্র নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য অনুকরণীয়। একটু খোঁজ নিয়ে দেখতে বলি, ব্রিটেনে বসে দেশের বিরুদ্ধে এ ধরনের প্রচার কেউ করতে পারে কিনা? তার শাস্তি কী হয় সেখানে?
শেখ হাসিনা তাঁর সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, আমি জাতির পিতার সন্তান। আমার এর থেকে বড় পাওনা আর কী হতে পারে। এটা শেখ হাসিনা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। তবে তাঁর নিজের অর্জনও কম নয়। তিনি দু’বার সফল প্রধানমন্ত্রী। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীর বিচার করছেন। তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার রায় ও শাস্তি প্রদানের পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। তিনি দেশকে বিদ্যুত দিয়েছেন, খাদ্য দিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন। বাস্তবে তাঁর সফলতা লিখতে গেলে এ লেখা প্রসঙ্গান্তরে চলে যাবে, তাই তাঁকে শুধু অনুরোধ করব, গণতান্ত্রিক সরকার যে সব থেকে শক্তিশালী সরকার এই যে সত্য আপনি দেশের মানুষের সামনে দেখিয়েছেন এটা প্রতিষ্ঠিত করুন। দেশকে সামরিক কালচার থেকে বের করে আনতে এটা অনেক বড় পদক্ষেপ। তাছাড়া মানুষ সরকারের কাছে নিরাপত্তা চায়। সরকারকে সরকার হিসেবে দেখতে চায়, কোন সিদ্ধান্তহীন, ভীতু অবস্থায় সরকারকে দেখতে চায় না। ক্ষমতায় থাকার নির্ধারিত সময়ের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত দেশের মানুষ শেখ হাসিনার কাছে সেই ক্ষমতাবান সরকারই দেখতে চায়। শেখ হাসিনা যেন সেটাই নিশ্চিত করেন।

swadeshroy@gmail.com