মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
রবিবার, ২৯ জুলাই ২০১২, ১৪ শ্রাবণ ১৪১৯
ফিরে দেখা নভেরা আহমেদ
মিলু শামস
ভাস্কর নভেরা আহমেদ এখন কেমন আছেন? কেমন ছিলেন তিনি? স্মৃতি হাতড়ে শিল্পী হাশেম খান বললেন, ‘যদ্দুর মনে পড়ে, নভেরা আহমেদকে আমি প্রথম দেখি ১৯৫৬ সালে ঢাকায়। আমি তখন প্রথমবর্ষের ছাত্র। শহীদ মিনার তখন দাঁড়িয়ে গেছে। শিল্পী হামিদুর রহমানও তখন ঢাকায়। আমরা দল বেঁধে দেখতে যেতাম। আগেই শুনেছিলাম নভেরা আহমেদ শহীদ মিনারের ওপরের চত্বরে কিছু ভাস্কর্য করেছেন। দুয়েকটা কাগজে সে নকশার খবরও বেরিয়েছিল। শহীদ মিনারের কাজ শেষে হামিদুর রহমান এবং নভেরা আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরির নিচ তলায় দুটো ম্যুরাল করছিলেন। সেখানে এ দু’জনকে একসঙ্গে কাজ করতে দেখেছি। নভেরা আহমেদ মাঝে মধ্যে আমাদের ক্যাম্পাসে যেতেন। অপূর্ব সুন্দরী ছিলেন। পোশাক আশাকে এত আধুনিক ছিলেন যা সে সময়ের ঢাকা শহরে দেখা যেত না। কালো রঙের শাড়ি পরতেন, গলায় থাকত নানা রকম রঙিন মালা। শহীদ মিনারের নিচে পূর্ব-দক্ষিণ দিক ঘিরে একটি গ্যালারি ছিল। কথা ছিল ওখানে একটি লাইব্রেরিও হবে। দেয়ালে থাকবে শহীদদের প্রতি নিবেদিত এবং বাংলাভাষা বিষয়ক কিছু ম্যুরাল। হামিদুর রহমান বেশ কিছু ম্যুরাল করেও ফেলেছিলেন। তখনি শুনেছিলাম মূল নকশা অনুযায়ী যেমন শহীদ মিনার শেষ করতে পারেননি তেমনি ম্যুরালগুলোও শেষ করতে পারেননি। ‘৭১ সাল পর্যন্ত যে শহীদ মিনারটি আমরা পেয়েছিলাম তা অসম্পূর্ণ ছিল। দেয়াল চিত্রগুলো ১৮৫৬-এর পরে আর এগোয়নি, সে সঙ্গে বলা যায় নভেরা আহমেদের যে ক’টি ম্যুরাল শহীদ মিনার চত্বরে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তৈরি হচ্ছিল, তা আর আলোর মুখ দেখতে পারেনি। এরপর ’৭১-এর ঘটনা সবার জানা, হানাদার বাহিনী ২৬ মার্চ রাতেই শহীদ মিনার গুঁড়িয়ে দেয়। যাই হোক, যত দূর মনে পড়ে, ’৫৬, ’৫৭, ’৫৮-এ সময়ে নভেরা ঢাকাতে ছিলেন। এরপর মাঝে মধ্যে আসতেন, ঢাকাতে তিনি একটি ভাস্কর্য প্রদর্শনী করেছিলেন ’৫৭ কি ’৫৮ সালে। এ ভাস্কর্যগুলো দেখে সে সময় আমরা আমাদের সীমিত জ্ঞানে বিস্মিত হয়েছিলাম। যদিও সে সময় ভাস্কর্য শিল্প, শিল্পের মনোত্তীর্ণতা নিয়ে খুব একটা জানতাম না। নভেরার এ ভাস্কর্য নিয়ে সে সময় ঢাকার শিল্পবোদ্ধাদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল, অনেক শিল্পবোদ্ধা এগুলোকে অত্যন্ত উঁচুমানের ভাস্কর্য বলে অভিমত দিয়েছিলেন এবং তার মেধার প্রশংসা করেছিলেন। আবার কেউ কেউ সেগুলোকে পাকিস্তানের সে সময়ের প্রেক্ষাপটে বিরূপ সমালোচনা করেছিলেন।’ সে সময় কিংবা তার পর পরই নভেরা আহমেদ রেঙ্গুনে একটি প্রদর্শনী করেছিলেন এবং তা যথেষ্ট প্রশংসা পেয়েছিল। একজন শিল্পী হিসেবে তিনি সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন। উন্নত দেশের আধুনিক ধারার ভাস্কর্যের সঙ্গে পরিচয় ছিল নভেরার এবং সে ধারার সঙ্গে নিজের কাজ যুক্ত করে দেশীয় একটি ঘরানা তৈরি করেছিলেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি, পাবলিক লাইব্রেরি ও চারুকলা চত্বরে তিনি যে ভাস্কর্য করেছিলেন সেগুলো অযতেœ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল। রাষ্ট্র, সমাজ এমনকি শিল্পীরাও তার ভাস্কর্যকে অবহেলা করেছেন। যে জন্য এ অপূর্ব ভাস্কর্যের অনেকগুলোই প্রায় পুরো নষ্ট হয়েছে কিছু কিছু ভাস্কর্যের অংশবিশেষ নষ্ট হয়েছে। দীর্ঘদিন পর গত শতকের নব্বই দশকে নভেরা আহমেদের ভাস্কর্য, শহীদ মিনারের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ইত্যাদি আবার গুরুত্ব পেতে থাকে। গত আওয়ামী সরকারের আমলে শিল্পকলা একাডেমী ও জাদুঘর নভেরার ভাস্কর্য সংরক্ষণে বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়। পাবলিক লাইব্রেরির সামনে ভাস্কর্যগুলো সংরক্ষণ করে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ তখন নভেরা আহমেদের একটি প্রদর্শনীও করেছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে সম্মানিত করতে একুশে পদক দিয়েছিলেন। তিনি প্যারিসে বিশেষ দূতও পাঠিয়েছিলেন নভেরাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে, কিন্তু তিনি আসেননি।
বিস্ময়কর প্রতিভার এই নারীকে নিয়ে সাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাই ‘নভেরা’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছেন। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত সে উপন্যাসে এক জায়গায় শিল্পী মুর্তজা বশীরের জবানীতে বলা হয়েছে, ‘তাকে আমি প্রথম দেখি ঢাকায় ১৯৫৮ সালে। তখন আমিনুল ফ্লোরেন্স থেকে এসেছে। একদিন বলল, আরে হামিদ এসেছে, সঙ্গে নভেরা নামের একটি মেয়ে। দু’জনে শহীদ মিনারে কাজ করছে। বলে আমিনুল হেসেছিল। শুনে আমার কৌতূহল হলো। সেই সময়ে একটা বাঙালী মেয়ে প্রায় সম্পর্কহীন একজন পুরুষের সঙ্গে এই ভাবে থাকতে পারে ভাবতে অবাক লেগেছে বললে কম বলা হবে। প্রায় অবিশ্বাস্য, তাকে দেখতে পুরনো ঢাকায় হামিদদের বাড়ি আশেক লেনে গিয়েছিলাম আমিনুলকে সঙ্গে নিয়ে। দেখলাম নভেরা খুব সুন্দরী। বড় বড় চোখ, কাজল দেয়া, শরীর আকর্ষণীয়, একটু গোলগাল। কালো শাড়ি পরে আছে। সব মিলিয়ে সুন্দরী। কিন্তু আমার কাছে তাকে মনে হয়েছে প্রাণহীন। যেন একটা সুন্দর মৃতদেহ। যে ক’বার দেখেছি তাকে হাসতে দেখিনি, সব সময় বিষণœ থাকত। তাঁর সময়ের শিল্পীদের চোখে নভেরার বাইরের রূপ এমনই ছিল।
অন্তরে তিনি ছিলেন প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী, আত্মবিশ্বাসী এবং একরোখা ধরনের। তাকে ঘনিষ্ঠভাবে চিনতেন যারা তারা প্রায় কেউই এখন বেঁচে নেই। তার বাবা ছিলেন এক্সাইজ অফিসার। পূর্ব পাকিস্তানের কুমিল্লায় বদলি হন ১৯৪৭ সালে। নভেরার বিয়ে হয় ১৪ বছর বয়সে তাঁর অনিচ্ছায়। মূলত তাঁর বাবার পীড়াপীড়িতে বিয়ে হয়েছিল। ছ’সাত মাস পর বিয়েটা ভেঙ্গে যায়। বিয়ে হয়েছিল সম্ভবত ১৯৪৫ সালে কলকাতায়। ভাস্কর্য বিষয়ে পড়াশোনা করতে তিনি লন্ডন যান ১৯৫১ সালে। সেখানেই শিল্পী জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়।
ভাস্কর্যের ওপর তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুরুও সেখানে। লন্ডনের ক্যাম্বারওয়েল আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে। সেখানেই শিল্পী হামিদুর রহমানের সঙ্গে পরিচয় ও বন্ধুত্ব। হামিদুর রহমান বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন তাঁকে। দু’জনের মধ্যে চমৎকার বোঝাপড়ার জন্য তাদের যৌথ কাজগুলোও অপূর্ব হয়ে ওঠে।
হামিদুর রহমান ও নভেরা শহীদ মিনারের কাজ শুরু করেন ১৯৬৭ সালে। শহীদ মিনারের জন্য অনেক মডেল জমা পড়লেও হামিদ-নভেরার ডিজাইনটিই নির্বাচিত হয়। প্রায় একমাস খেটে দু’জনে ডিজাইনটি তৈরি করেছিলেন। ’৫৭-এর একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। কাজ চলে ’৫৮ সাল পর্যন্ত। কিন্তু শেষ হওয়ার আগেই মার্শাল ল জারি হওয়ায় শহীদ মিনারের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ভীষণ ভেঙ্গে পড়েছিলেন নভেরা। এরপর ’৫৮ সালের শেষ দিকে তিনি এয়ারপোর্ট রোডে এম আর খান নামে এক ব্যবসায়ীর বাড়ির সামনে (এখন যেখানে পারটেক্স গ্যালারি) একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করেন। ১৯৫৯ সালে পাকিস্তান ইউনাইটেড এ্যাসোসিয়েশনের অর্থ সহায়তায় একটি একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী করেছিলেন নভেরা আহমেদ।
১৯৫৯ কিংবা ষাটে নভেরা লাহোর চলে যান। একষট্টি সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত ‘ন্যাশনাল এক্সিবিশন অব পেইন্টিং স্কাল্পচার এ্যান্ড গ্রাফিক আর্টস নামে এটি প্রদর্শনীতে তার ছ’টি ভাস্কর্য স্থান পেয়েছিল। প্রদর্শনীতে ‘চাইল্ড ফিলোসফার’ নামে তাঁর একটি ভাস্কর্য ‘বেস্ট স্কাল্পচার’ পুরস্কার পায়। নভেরার সে পুরস্কার শুধু নারী ভাস্কর্যর হিসেবে নয় শিল্পকর্ম হিসেবে ভাস্কর্যের প্রথম স্বীকৃতি ছিল। এর আগে পশ্চিম পাকিস্তানে ভাস্কর্য করার ওপর এক ধরনের অলিখিত নিষেধাজ্ঞা ছিল। লাহোরে কয়েক বছর থাকার পর নভেরা চলে যান বোম্বেতে। সেখানে ইসমত চুগতাইর বাড়িতে কিছুদিন ছিলেন। বোম্বে থেকে প্যারিসে তারপর আবার গিয়েছিলেন লাহোরে। বেশিদিন থাকেননি। বিভিন্ন দেশ ঘুরে শেষে প্যারিসেই স্থায়ী হন। সম্ভবত ১৯৮৮তে সড়ক দুর্ঘটনায় একটি পা হারান সে সময় খুব অর্থকষ্টেও নাকি ছিলেন।
তাকে শেষ দেখেছেন নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। ১৯৯৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সফরে ফ্রান্সে গিয়ে। সে অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওনাকে শুধু দেখেছি, কথা হয়নি। বয়স হয়েছে। ভাস্কর্য করাও ছেড়ে দিয়েছেন। নভেরা আহমেদ সম্পর্কে কল্পনায় অনেক কিছু ছিল কিন্তু তখন তিনি একজন সাদা-মাটা বয়স্ক নারী।’
সেই পঞ্চাশের দশকে যখন এদেশে শিল্পকলার প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা হাঁটি হাঁটি পা পা করছে সে সময় একজন নারীর ভাস্কর হিসেবে বিকশিত হওয়া সহজ কথা নয়। তাঁর ভাস্কর্য দেখলে, তাঁর জীবন সম্পর্কে কৌতূহল জাগবেই।
এখন তিনি প্যারিসে লোকচক্ষুর আড়ালেই রয়েছেন। হয়ত একদিন পৃথিবী থেকেও হারিয়ে যাবেন। কিন্তু তাঁর ভাস্কর্যগুলো চিরকাল বলে যাবে, সময়ের চেয়ে অগ্রগামী এক নারী জন্মেছিলেন, তাঁর নাম নভেরা। তিনি ছিলেন আছেন... থাকবেন... শিল্পীর মৃত্যু নেই।