মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১১, ১৪ আশ্বিন ১৪১৮
পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত নির্বাচনের সঙ্গে জড়াতে চাচ্ছে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি
স্বদেশ রায়
মমতা ব্যানার্জী কখনই বেনজির ভুট্টো বা শেখ হাসিনা নন। এমনকি তাঁর দেশের সুষমা স্বরাজও নন। তিনি নিতান্ত ভারতের পিছিয়ে পড়া একটি প্রদেশের একজন রাজনীতিক। প্রদেশকেন্দ্রিক ও বিরোধিতার জন্যে বিরোধিতা করা এমনটিই প্রায় দেখা গেছে তাঁর রাজনীতির ক্ষেত্রে। রাজনৈতিকভাবে তিনি খুব রাজনৈতিক আদর্শ অনুসরণ করেন এমনও তাঁর রাজনৈতিক জীবন বলে না। বরং তাঁর রাজনৈতিক জীবন অনেকখানি মিলে যায় আমাদের দেশে যাঁরা দলবদলের রাজনীতি করেন তাঁদের সঙ্গে। তাছাড়া তাঁর রাজনীতি ও আদর্শ হিসেব করতে গেলে মনে রাখতে হবে তিনি বিজেপির সঙ্গে ঘর করেছেন। তাই তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ সর্বোচ্চ টগর বোষ্টমীর মতো। হয়ত মিনসেকে তিনি হেঁসেলে ঢুকতে দেননি। অনেকে মনে করতে পারেন, মিনসেকে হেঁসেলে ঢুকতে না দেয়ার কারণেই আজ তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে আছেন। আবার কেউ কেউ মনে করতে পারেন, প্রকাশ কারাতের ভুলের কারণেই আজ কংগ্রেসের সঙ্গে মমতা। নইলে হয়ত ভারতের রাজনীতিতে আজ কংগ্রেস ও বামরা মিলে আরও বেশি শক্তিশালী ও উদার গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করতে পারত। যাহোক, সেটা ভারতের রাজনীতির বিষয়। তবে শুধু মাত্র বিরোধিতার জন্যে বিরোধিতা করার ভেতর দিয়ে প্রদেশকেন্দ্রিক রাজনীতি করার ফলে রাজনৈতিক কূটনীতিতে মমতা ব্যানার্জী তাঁর সমসাময়িক বা কিছু সিনিয়র এই উপমহাদেশের মহিলা রাজনীতিকদের থেকে অনেক পিছিয়ে আছেন। এই পিছিয়ে থাকার প্রমাণটি তিনি দিলেন, এবার ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশ সফরে না এসে এবং শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশ সফর বাতিল করে। মমতার এই সফর বাতিলটা অনেকটা গ্রামীণ সংস্কৃতি; যে সংস্কৃতির প্রকৃত ছবিটি আমাদের দেখিয়েছেন শরৎচন্দ্র তাঁর পলস্নী সমাজে। অবশ্য এই পল্লী সমাজের সংস্কৃতি রাজনীতিতে আনার কথা নয় মমতার। কারণ, তাঁর জন্ম নগরে। অবশ্য তাঁর যখন জন্ম হয়েছে তখন কলকাতা নগর সংস্কৃতিতে অনেক পিছিয়ে পড়েছে। দেশভাগসহ নানান কারণে কলকাতা ভরে উঠেছে গ্রামীণ মানুষে। এই গ্রামীণ মানুষ আর অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া এই দুই মিলে কলকাতা তখন ক্রমেই একটি গ্রামীণ জনপদ হতে চলেছে। তাই সেখানে কলকাতা তার দীর্ঘ অর্জিত নাগরিক সংস্কৃতি অনেকটা হারিয়ে ফেলবে এটাই তো স্বাভাবিক। আর হয়ত এটাই স্পর্শ করেছে মমতা ব্যানার্জীকে। তা না হলে তিসত্মা পানি চুক্তি না হলেও তাঁর বাংলাদেশ সফর বাতিল করার কোন কথা নয়। তাঁর এ সফরে আসাটাই ছিল স্বাভাবিক। যে কারণে তিসত্মা পানি বণ্টন চুক্তি হচ্ছে না জেনেও বাংলাদেশ সরকার এয়ারপোর্টে মমতা ব্যানার্জীর জন্যে আলাদ গাড়ি রেখেছিল। ছিল তাঁর প্রটোকলের প্রস্তুতি। কারণ, মনমোহনের সফরটা তো শুধু তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তিকে কেন্দ্র করে ছিল না। এই সফর ছিল প্রতিবেশী দুটি দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের একটি স্মারক। এখানে সংস্কৃতিগত দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি অনেক বেশি প্রয়োজন ছিল। যেমন দিলিস্নতে ভারতের সংস্কৃতি মন্ত্রীকে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল ভারতে দেখতে দেয়াসহ ভারত-বাংলাদেশ সংস্কৃতি বিনিময় আরও বাড়ানোর বিষয়ে কথা তুললে তিনি বলেছিলেন, বিষয়টি নিয়ে তাঁরা বেশ সমস্যায় আছেন। এই সমস্যাটির মুখোমুখি তাঁদের হতে হয় শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের সঙ্গে কালচারাল টাই বা ট্রিটি করতে গেলে। কারণ শ্রীলঙ্কা চায় তামিলনাড়ুর সঙ্গে সংস্কৃতির বিনিময় আর বাংলাদেশ চায় পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে। কিন্তু ভারতের পৰে অন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সঙ্গে তো সেটা কিছুটা অসম্ভব। কারণ, তারা তো চুক্তি করবে একটি দেশের সার্বিক সংস্কৃতি বিনিময়ের জন্যে। কোন প্রদেশের জন্যে তো নয়। সংস্কৃতিগতভাবে পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের মধ্যে এই যোগ রয়ে গেছে। তাই এখানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায় থাকে তাদের কেন্দ্রের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলা আবার কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশে আসার সুযোগ পেলে সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে সার্বিকভাবে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি সুসম্পর্ক গড়ে তোলার কাজে অংশ নেয়া।
রাষ্ট্রনীতির ৰেত্রে, কূটনীতির ৰেত্রে কোন একটি বিষয়ে সমঝোতা হচ্ছে না বলে কথা বলা বন্ধ করার কোন সংস্কৃতি নেই। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার কি সেটা করে? একদিকে পাকিসত্মান থেকে জঙ্গী এসে দিলস্নীতে হামলা করছে অন্যদিকে ভারত ও পাকিসত্মানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কি বৈঠক করছে না! কূটনীতিতে এটা তো স্বাভাবিক বিষয়। যেমন মনমোহন সিংয়ের সফরে বাংলাদেশ ও ভারতের ভেতর অন্যতম আলোচনার বিষয় ছিল দুই দেশের ভেতর সীমানত্মে বেসামরিক লোক হত্যাকে জিরো অবস্থানে নামিয়ে আনা। বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘ সীমানত্ম। এ ৰেত্রে কি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর কোন ভূমিকা থাকতে পারে না? তাঁর উপস্থিতি কী ভিন্ন কোন মাত্রা যোগ করে না? তেমনি তাঁর উপস্থিতি দুই দেশের সংস্কৃতি বিনিময়ের ৰেত্রেও কোন নতুন দিক উন্মোচন করতে সহায়তা করতে পারত। সর্বোপরি তাঁর উপস্থিতি অনেকটা মেঘ কমিয়ে দিত মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের আকাশ থেকে। প্রমাণিত হতে পারত আসলে ভারত চায় বাংলাদেশের সঙ্গে একটি সুসম্পর্ক। তিসত্মা নদীর পানি বণ্টন বিষয়টি টেকনিক্যালি একটু দেরি হচ্ছে। কিন্তু তার বদলে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে, জল-পানি স্পর্শ না করে গোটা বিষয়টিকে বিষময় করে তুললেন মমতা। বাংলাদেশ হলো আহত। আর ভদ্রলোক মনমোহন হলেন বিব্রত।
হঁ্যা, খোঁজ নিয়ে যতটা জানা গেছে তাতে বলা যায়, মমতা এখানে তাঁর নিজের প্রদেশের, নিজের দলের রাজনীতি দেখেছেন। আর এই রাজনীতি দেখতে গিয়ে তিনি শুধু বাংলাদেশের সঙ্গে নয় তাঁর নিজ দেশের কেন্দ্রের সঙ্গে করেন কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ। তাঁর দেশের কেন্দ্রের সঙ্গে তিনি করতে সাহস পেয়েছেন কারণ, কংগ্রেস জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম দলটি তাঁর। কেন্দ্রে কংগ্রেসের ২০৫ আসনের পরেই তার বিশটি আসন। একটি জোট সরকারের ভেতর এমন একটি অবস্থান নিয়ে থাকা অনেক সুবিধার। সেই সুবিধাই মমতা ব্যানার্জী নিয়েছেন। অন্যদিকে এ মুহূর্তে তিসত্মা নদীর পানি বণ্টন চুক্তিতে তিনি বাধা দিয়েছেন সম্পূর্ণ তাঁর দলীয় স্বার্থ থেকে। এবং সেটা তাঁর আগামী পঞ্চায়েত নির্বাচনকে মাথায় রেখে। মমতা ব্যানার্জী ও তার কংগ্রেস-তৃণমূল জোট সে রাজ্যের বিধান সভায় ৰমতায় এলেও এখনও তুলনামূলক অর্থে পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত পরিষদে বা তৃণমূলে সিপিএমের বা বামফ্রন্টের একটি শক্ত অবস্থান রয়ে গেছে। মমতা চান পঞ্চায়েতে সিপিএমের যে শক্ত অবস্থান সেটা ভেঙ্গে দিতে। আর এজন্যে তিনি পরিকল্পনা নিয়েছেন পঞ্চায়েত নির্বাচন এগিয়ে আনা। স্বাভাবিকভাবে পশ্চিমবঙ্গে আগামী পঞ্চায়েত নির্বাচন ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত হবার কথা। মমতা ব্যানার্জী এটাকে ২০১২ সালে এগিয়ে আনতে চান। তিনি চান যে জনপ্রিয়তার জোয়ারে তিনি ৰমতায় এসেছেন ওই জনপ্রিয়তার জোয়ার থাকতে থাকতে পঞ্চায়েত নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে সেখানেও একটি বড় বিজয় আনতে। যে বিজয়ের ভেতর দিয়ে তিনি ভেঙ্গে দিতে চান তাঁর প্রতিপৰ সিপিএমের শেষ অবস্থান বা তৃণমূলের অবস্থানটুকু। তাই ২০১২ সালের আগে তিনি কোন মতেই তিসত্মা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি করতে রাজি নন। কারণ, তিসত্মা অববাহিকা যেটুকু পশ্চিমবঙ্গে ওই এলাকায় তাঁর নিজ সংগঠনের অবস্থান আদৌ ভালো নয়। সেটা মূলত কংগ্রেসের এলাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে বামফ্রন্ট। কংগ্রেস নিয়েও মমতার ভয় আছে। কারণ কংগ্রেসের বড় একটি ভোট পশ্চিমবঙ্গে আছে। বামফ্রন্ট্রের এই পরাজয়ের পর, মমতার ব্যর্থতা নেমে এলে তখন পুরনো সংগঠন, কেন্দ্রের অবস্থান সব মিলিয়ে আবার ভস্ম থেকে জেগে উঠতে পারে কংগ্রেস। তাই সব মিলিয়ে ওই এলাকায় নিজের অবস্থান শক্ত করতে চান মমতা। ওই অবস্থান শক্ত করার জন্যে তাঁর মতো রাজনীতিকের দরকার কোন একটি গিমিক সৃষ্টি করা। আর সেটা তিনি করতে চান এই বলে যে, কেন্দ্রের অবস্থানের বিপৰে দাঁড়িয়ে তিনি বাংলাদেশকে তিসত্মার পানি বণ্টন চুক্তির পথে বাধা হলেন। তিনি পশ্চিমবঙ্গের ওই এলাকার মানুষের জন্যে সেটা রেখে দিয়েছেন। সিপিএম প্রথমে না বুঝলেও পরে বিষয়টি বুঝতে পেরেছে। তাই তাঁরাও ইউটার্ন নিয়েছেন। তাঁরাও এখন বলছেন, ২৫ ভাগের বেশি নয় বাংলাদেশের জন্য তিসত্মার পানি। বাসত্মবে তিসত্মা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি এখন পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত নির্বাচনের সঙ্গে জড়িয়েছেন সে দেশের রাজনীতিকরা। বিশেষ করে মমতা ব্যানার্জী। আর তাদের লৰ্য ২০১২-এর ওই পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে তিসত্মা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি নয়।
তবে পশ্চিমবঙ্গের এই রাজনীতি নিয়ে বাংলাদেশের খুব মাথা ব্যথার কোন কারণ থাকতে পারে না। আনন্দ বাজার পত্রিকা যাই লিখুক না কেন, বাংলাদেশকে বোঝা পড়া করতে হবে দিলস্নীর সঙ্গে। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের বোঝা পড়ার কোন কারণ নেই। পশ্চিমবঙ্গের বিষয়টা সম্পূর্ণ ভারতের অভ্যনত্মরীণ বিষয়। এ নিয়ে আরেকটি সম মর্যাদার স্বাধীন দেশের কোন চিনত্মা করা বা অন্য কোন কিছু করার সুযোগ নেই। তাছাড়া ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে সব রাজ্যই সমান। কেন্দ্রের কাছে পশ্চিমবঙ্গও যা আসাম, মিজোরাম, ত্রিপুরা, মনিপুরও তাই। শেখ হাসিনা বা বাংলাদেশের বর্তমান সরকার গত আড়াই বছরে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাষ্ট্রগুলোর শানত্মি প্রতিষ্ঠায় যা করেছেন সেটা ভারতের কেন্দ্রের উপলব্ধি করার ৰেত্রে কোন কষ্ট হবার কথা নয়। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার নিশ্চয়ই উপলব্ধি করতে পেরেছেন সেই পঞ্চাশের দশক থেকে মিজো নেতা ফিজোকে পূর্ব পাকিসত্মানে আশ্রয় দিয়ে ভারতের সেভেন সিস্টারকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কবলে ঠেলে দেয়ার যে কাজ শুরম্ন হয় তার সমাপ্তি টানলেন এসে এবার শেখ হাসিনা। আজ যে ইউনাউটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব অসম (আলফা)-এর সঙ্গে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার শানত্মি চুক্তি করে উত্তর-পূর্ব ভারতে শানত্মি প্রক্রিয়া শুরম্ন করতে পারল এটা একমাত্র শেখ হাসিনার অবদান। শেখ হাসিনা নিজে শানত্মিতে বিশ্বাস করেন। তিনি কোনরূপ সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দেয়ার পৰে নন। তিনিই বর্তমান পৃথিবীতে একমাত্র সরকার প্রধান যিনি বার বার সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েও বেঁচে আছেন এবং নির্ভয়ে সন্ত্রাসের বিরম্নদ্ধে নিজ অবস্থান ধরে রেখেছেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রৰমতায় শেখ হাসিনার মতো এমন আনত্মর্জাতিক সন্ত্রাসবাদবিরোধী সাহসী নেতা আছেন বলেই কিন্তু ভারতের এই শানত্মি প্রক্রিয়া সম্ভব হয়েছে। এই শানত্মি প্রক্রিয়ার ফল সর্বভারতীয় রাজনীতির জন্যে কতখানি, বর্তমান বিশ্ব সন্ত্রাসবাদের বিপৰে কত বড় সেটা হয়ত একটি পিছিয়ে পড়া প্রদেশের রাজনীতি করে মমতা ব্যানার্জীর পৰে বোঝা সম্ভব নয়। কিন্তু আনত্মর্জাতিক মানের শিৰিত নেতা মনমোহন, অনেকের অনূকরণীয় নেতা সোনিয়া গান্ধীর উপলব্ধিতে কোন কমতি থাকার কথা নয়। তাই বাংলাদেশ যেমন অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ করে ভারতের বিশাল এলাকার সাধারণ মানুষকে শানত্মির মুখ দেখাতে সাহায্য করেছে তেমনি ভারতকেও করতে হবে বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সম্মানজনক সমাধান। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে অবশ্যই বাংলাদেশে তিসত্মা অববাহিকায় পানির অভাবে যে দারিদ্র্য নেমে এসেছে এই দারিদ্র্য ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় রোধ করে শানত্মি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে হবে। তাছাড়া মমতা ব্যানার্জীর মতো রাজনীতিকরা একটি পঞ্চায়েত নির্বাচনের লাভের কাছে, আশু দলীয় লাভের কাছে প্রকৃতিকে বলি দিতে পারেন। কিন্তু মনমোহন বা সোনিয়া গান্ধীর মতো নেতার কাছে সেটা কেউ আশা করে না। আগামী প্রজন্মের শিৰিত নেতাদের কাছে তো কেউই সেটা আশা করে না। কারণ, প্রকৃতির স্বাভাবিক গতিতে হসত্মৰেপ করে পৃথিবী জুড়ে মানুষ যে বিপর্যয় ডেকে আনছে এই বিপর্যয় ঠেকানোর জন্যে এখন অনেক কিছুই নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। আর সেই শুভ উদ্যোগে যদি ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে পূর্ণ বিবেচনা করতে হয় যে, এ বাধ থাকবে কি থাকবে না_ সেটাও ভবিষ্যত প্রজন্মকে বা বর্তমানের নতুন প্রজন্মকে ভাবতে হবে। কারণ, মানুষকে সর্বস্বানত্ম করা বা মা প্রকৃতিকে ধ্বংস করার অধিকার কারও নেই। এই সত্য এখন উপলব্ধির সময়, অনত্মরে গ্রহণ করার সময়। এখন এ নিয়ে রাজনীতি করার সেই মানসিক দীনতার দিন থেকে বের হয়ে আসার সময়। নতুন পৃথিবীকে এভাবেই সাজাতে হবে নতুন প্রজন্মকে। আজকে আরব গণতন্ত্রের পথে এগুচ্ছে আর অগ্রসর মানসিকতার জাতি গোষ্ঠী সেখানে প্রকৃতি ধ্বংসের কাজে লিপ্ত থাকতে পারে না।
তাই তিসত্মার পানি বণ্টন চুক্তি যদি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকরা তাঁদের পঞ্চায়েত নির্বাচনের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেন সেটা কোন আধুনিক রাজনীতি বলে বিবেচিত হবে না। আর সে কাজ সামলানোর দায়িত্ব ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের। সেটা তাদের অভ্যনত্মরীণ বিষয়। অন্যদিকে গত আড়াই বছর ধরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যেভাবে এগিয়ে চলেছে এবং বিশ্বায়নের পৃথিবীতে এখন আঞ্চলিক যোগাযোগ যে গুরম্নত্বপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে তাতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার কোন হিসাবেই জড়াতে পারে না পশ্চিমবঙ্গের এই গ্রামীণ রাজনীতির সঙ্গে। কারণ, ভারতের অবস্থান এখন বিশ্ব রাজনীতিতে অনেক বড়। ভারত আগামী দিনের বিশ্বে তৃতীয় অর্থনৈতিক শক্তি হতে চলেছে। বিশ্বের এই তৃতীয় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে ভারতকে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে হলে অবশ্যই তাঁকে আঞ্চলিক সহযোগিতায় মনোযোগী হতে হবে। আর সে ৰেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রকৃত সুসম্পর্ক গড়ে তোলা দিলস্নীর জন্যে কি অপরিহার্য নয়?
আর এই সুসম্পর্ক কখনই এক পৰীয় হবে না। এটা অবশ্যই হতে হবে দুই পৰের স্বার্থ ও সম্মান সমানভাবে রৰার ভেতর দিয়ে। অবশ্য মনমোহন সিংয়ের সফরের ভিতর দিয়ে তার কিছু প্রতিফলন ঘটেছে। তিসত্মা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে জটিলতা হয়েছে, এ জটিলতা কাটানো এখন তাদের কেন্দ্রের রাজনৈতিক সিদ্ধানত্মের ওপর নির্ভর করছে। এ ৰেত্রে আর কোন সমস্যা নেই। তবে মনমোহন সিংয়ের এই সফরে মমতা ব্যানার্জী না আসা ও ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের চার মুখ্যমন্ত্রীর আনত্মরিক সফরের ভেতর দিয়ে আরেকটি বাসত্মবতা বাংলাদেশের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশকে এখন অতীতের সেই পশ্চিম বাংলামুখী মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। পশ্চিম বাংলায় বাঙালী আছে ঠিকই, তাদের সঙ্গে সংস্কৃতির একটি মিল আছে ঠিকই। কিন্তু রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক সংস্কৃতির পাশাপাশি আরও বেশি দৃঢ় হয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভেতর দিয়ে। উত্তর-পূর্ব ভারতে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ আছে এবং ভৌগোলিকভাবে এই সম্পদ ব্যবহারে বাংলাদেশ ও উত্তর-পূর্ব ভারত অনেকটা অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। তাই শেখ হাসিনা যেমন ওই এলাকায় শানত্মি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছেন তেমনি উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশের মিলিত অর্থনীতির আরেক দিগনত্ম খোলার নেতৃত্ব শেখ হাসিনাকে নিতে হবে। শেখ হাসিনার এ নেতৃত্ব ভারতকে যেমন বিশ্বের তৃতীয় অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপানত্মরিত করতে সহযোগিতা করবে তেমনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিনির্মাণে হবে সহায়ক। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও বাংলাদেশ সরকারকে সেভাবেই চিন্তা করতে হবে। পশ্চিমবঙ্গে কিছু লোককে আমাদের নাটক দেখানো থেকে আমাদের যে কোন সাবান উত্তর-পূর্ব ভারতে বিক্রি করা বাংলাদেশের জন্য অনেক লাভ। এ সত্য উপলব্ধিরও সময় এখন।
swadeshroy@gmail.com