মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ১৮ জুন ২০১১, ৪ আষাঢ় ১৪১৮
অভিমত
আমাদের দেশে হবে, সেই ছেলে কবে
শাহ্ নেওয়াজ খান
শুরু হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতা ব্যানার্জীর পথচলা। তার প্রতিটি পদক্ষেপে জাতীয় জীবন থেকে দূর হচ্ছে গণতন্ত্রের জঞ্জাল। বিমোহিত হচ্ছে জনগণ। কমছে তাদের হৃদয়ে না পাওয়ার যন্ত্রণা। এগুলো তার পক্ষেই সম্ভব কারণ জনকল্যাণের মেরাথন দৌড়ে তিনি দেখেছেন রাজ্যের জনগণের জীবন-জীবিকা। শুনেছেন বঞ্চিত মানুষের হাহাকারের চিত্র। মোকাবেলা করেছেন প্রতিপৰের শত আক্রমণ, কুৎসা, চরিত্র হনন এবং অপপ্রচার। কোন কিছুতেই যেন তার সে গতিরোধ হয়নি। এমনি করেই গড়ে উঠেছে জনগণের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক।
জনগণের ভালবাসায় সিক্ত মমতা, আজ পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। ক্ষমতা গ্রহণের ১৯ দিনের মাথায় সিঙ্গুরের অধিগ্রহণকৃত জমি অনিচ্ছুক কৃষকদের মাঝে ফিরিয়ে দিতে সোচ্চার হয়েছেন তিনি। এই মুহূর্তে জনগণের আকুণ্ঠ সমর্থনে ভাসছে তাঁর নেতৃত্ব। এখানেই ক্ষান্ত দেননি তিনি, ছুটছেন স্বাস্থ্য পরিসেবা উন্নয়ন, রাস্তার যানজট নিরসনসহ নাগরিক পরিসেবার অধিকতর উন্নয়নে।
বড্ডো আফসোস এ জাতির। একই চিত্র কিন্তু দিশারী দুই পথের। স্বাধীন বাংলা আর ওপার বাংলার জীবন যাত্রায় অজস্র মিল থাকলেও অমিল শুধু রাজনীতির প্রেৰাপট। এ দেশেও ২০০৮ সালে বিগত জোট সরকারের দুর্নীতি আর নানান অনিয়মের অভিযোগের ফিরিস্তি দিয়ে জন-সমর্থন আদায় করে আওয়ামী লীগ। কিন্তু ক্ষমতায় এসে আজও পর্যনত্ম তাদের সে সমস্ত অভিযোগের বিপরীতে দেশের জনগণের মাঝে ছড়াতে পারেনি স্বসত্মির কোন সুবাতাস।
কথার কথায় পরিণত হয়েছে অন্য সব অভিযোগের মতো তৎকালীন জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রীর পরিবার ও যোগাযোগমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ভারতীয় টাকায় মাত্র ২৬ হাজার টাকার সিএনজি দেশে ৬ লাখ টাকায় বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ। মাত্রাতিরিক্ত টাকায় কেনা সিএনজি মালিকরা যখন সুদে-আসলে জনগণের কাছ থেকে মাসুল আদায় শুরম্ন করে তখন নির্বাক থাকে সরকার। স্বল্প আয়ের মানুষগুলোকে মুখ বুজে সহ্য করতে হয়েছে অর্থনৈতিক বাড়তি সে চাপ। ফলে সরকারের প্রতি জনগণের নেতিবাচক মনোভাবে ঘটে ক্ষমতার পালাবদল। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পায় আওয়ামী লীগ।
তারপর চলছে দেশ, মনে হয় সরকার ভুলে গেছে জনগণের সেই দুর্ভোগের কথা। ফলে জনগণকে সেদিনের অর্থনৈতিক বাড়তি চাপের বোঝা আজও বহন করতে হচ্ছে। জননেত্রী শেখ হাসিনা যেখানে ডিজিটাল পদ্ধতির কথা বলে জাতিকে চমক দিয়েছেন, সেখানে দুই দেশের মুদ্রা বিনিময় হারের বিপরীতে সুলভমূল্যে সিএনজি বিক্রির ব্যবস্থা করা কি খুব কঠিন কাজ? তা করলে অনত্মতপক্ষে জনজীবনে কমে যেত বাড়তি অর্থনৈতিক চাপের বোঝা। ফিরতো জনজীবনে স্বসত্মি, বাহবা পেত সরকার। জোট সরকারের বিরম্নদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে অনত্মত একটি দুর্নীতির চূড়ানত্ম রিপোর্ট সম্পন্ন করতে পারতো। কিন্তু তা না হওয়ায় ভোগানত্মি থেকে পরিত্রাণের আশা এ জাতির অধরাই রয়ে গেল।
জনদুর্ভোগ কমানো যদি জাতীয় রাজনীতিতে পরিত্যাজ্য বলে মনে হয় তাহলে প্রশ্ন তো উঠবেই : জাতির হতাশা ঘুচবে কবে?" আপাতদৃষ্টিতে উত্তরে 'না'র আধিক্ষ্য বেশি। কারণ এ দেশের নেতারা ক্ষমতা লাভের পর পরই তো জনগণের কথা ভুলে হয়ে পড়েন জমি-বাড়ির কারবারি। ফলে জনগণের সঙ্গে তাদের সূচিত হয় আমরা-তোমরা বিভাজন রেখা। না চাইলেও ভাগ্যহত জনগণের দীর্ঘ নিশ্বাস মিশে যায় হরতালের মতো নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সঙ্গে। এ কথা তো ঠিক যে, সরকার যদি জনগণের মৌলিক স্বার্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করে, তবে বিরোধীরা দেশে কোনভাবেই হরতালের সফলতা দাবি করতে পারে না।
সার্বিক প্রেক্ষাপটে পশ্চিম বাংলার জনগণের আত্মতৃপ্তিতে এ দেশে জন্মে হতাশা। জাতীয় জীবনে প্রতিধ্বনিত হয় কবির কবিতা, "আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে"। দ্রম্নত এ হতাশা কাটিয়ে দেশ ও জনদরদী নেতৃত্বের আবির্ভাব ঘটুক আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে। জাতীয় রাজনীতির উৎকর্ষতায় ভরে উঠুক সুজলা-সুফলা আমাদের দেশ। সৃষ্টিকর্তার কাছে আজ এমন প্রার্থনা জাতির।
info.bipul@yahoo.com


এখনই ভাবতে হবে
ছাবি্বর আহমদ অপু

আমাদের দেশে শিশু শ্রমিকদের অবস্থা অপরিবর্তিত শুধু নয়, পরিস্থিতির অবনতি পরিলৰিত হচ্ছে এবং অনেকটা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। শিশুশ্রমের বাসত্মব চিত্র দেখলে মনে হয় আমরা যেন স্বার্থপর সভ্যতায় বসবাস করছি। নিজের বিলাসী জীবনের জন্য শ্রমিকদের বয়সের দিকে নজর দিতে ইচ্ছাবোধ করি না। তাই অল্প বয়সী শ্রমিকদের দাম দিতেও কুণ্ঠাবোধ নেই। মানবসভ্যতার আধুনিকতার আস্ফালনে শিশুশ্রম আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমরা কতটা হীনম্মন্য। এখনও কত পথ আছে বাকি? উন্নত দেশগুলোর তুলনায় উন্নয়নশীল আর দরিদ্র দেশগুলোতে শিশুশ্রমের মাত্রা অনেক ভয়াবহ। বাংলাদেশে শিশুশ্রমের মতো নির্মম একটি বাসত্মবতাকে আমাদের মেনে নিতে হয় অনেক কষ্টে। আর আমাদের মাত্রাতিরিক্ত দরিদ্র ও শিশুশ্রমকে অনেকটা বাধ্যতামূলক করে তুলেছে।
শহরগুলোতে শিশু শ্রমিকের অভাব নেই। এই সমাজের শিৰিত ধনী ও অভিজাতরা এদের শখ করে নাম দিয়েছে 'টোকাই' 'পথশিশু' বা গৃহভৃত্য এবং বুদ্ধিজীবীরা এগিয়ে এসে এদের কপালে লিখে দিয়েছেন শিশুশ্রমিকের তকমা। আমাদের অনেক শিল্পই শিশুদের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে তাদের একেকটি সত্মম্ভ গড়েছেন। আমাদের প্রতিদিনের জীবনের আনাচে-কানাচে শিশু শ্রমিকেরা নিরনত্মর তুলে দেয় তাদের শ্রমের দান। সেখানে আমাদের প্রতিদান শূন্য। আমি ওই শিশুটির কথাই বলছি, যাকে এই বয়সেই কাজ করে জীবন চালাতে হয়। সকালে যে মেয়েটি আমাদের নাসত্মা বানিয়ে দেয় কিংবা সেই বাচ্চা ছেলেটির শ্রমের মূল্যই বা কোথায়। যে রিকশা চালিয়ে গায়ে অসহ্য গরম সহ্য করে আমাদের গনত্মব্যে পেঁৗছে দেয়। বাসের হাতল ধরে ঝুলতে থাকা ছেলেটি কিংবা কারখানায় কালো হয়ে যাওয়া শিশু মানুষগুলো। নয়তো গার্মেন্টস কারখানায় থাকা মেয়েটি। তাদের শ্রমের মূল্য কোথায়?
শিশুশ্রম প্রতিরোধ বিষয়ে এখন সব মহলে ভাবনা-চিনত্মা চলছে। সেই সঙ্গে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী শিশুদের অধিকার রৰার্থে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ১৯৫৪ সাল থেকে সারাবিশ্বে বিশ্ব শিশু দিবস পালন করা হচ্ছে। ১৯৫৯ সালে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশে এই শিশু অধিকার সনদে স্বাৰরকারী প্রথম ২২টি দেশের অন্যতম। তাছাড়া জাতিসংঘ ও আনত্মর্জাতিক শ্রম সংস্থার বিভিন্ন কনভেনশনে বাংলাদেশ অনেক আগেই সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে দেশের বেশকিছু আইন কঠিনভাবে শিশুশ্রমকে বাধাদান করে। বাংলাদেশের সংবিধানে ২৮ ধারায় শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য গুরম্নত্বারোপ করা হলেও কঠিন সত্য হলো, বাংলাদেশে ১৪ বছরের নিচে শিশুদের শ্রম অবৈধ নয়। ফলে শিশুশ্রমের ধাপটি সমানতালে চলছে শিল্প-কারখানায়, গার্মেন্টেসে এমনকি রিকশাচালকদের মধ্যেও। অথচ জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের ৫৪নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ১২ বছরের নিচে কোন শিশুকে কাজে নিয়োগ করা যাবে না। ১৪ বছরের নিচে কোন শিশুকে কল-কারখানায় নিয়োগ দেয়া যাবে না। ১৫ বছরের নিচের কোন শিশুকে পরিবহন খাতে কাজ দেয়া যাবে না। ১৬ বছরের নিচে সাধারণ কারাগারে রাখা যাবে না কিংবা মৃতু্যদ- দেয়া যাবে না। এ নীতিটি বাসত্মবসম্মত সন্দেহ নেই। তবে বাসত্মবতার রূপ আলাদা। দেশে এখনও দারিদ্র্যের ঘনীভবন ও ভয়াবহতার মাত্রা ব্যাপক।
শিশুরাই সুশোভিত ও গৌরবময় আগামীর পথনির্দেশক। তাই বাংলাদেশের আইনে শিশুদের যে অধিকার রয়েছে তা বাসত্মাবায়নের জন্য সবার সদিচ্ছা, আনত্মরিকতা ও দায়িত্বশীল আচরণ অবশ্যই কাম্য।
sabbir.mc@gmail.com