মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ২০ এপ্রিল ২০১১, ৭ বৈশাখ ১৪১৮
সংবিধান সংশোধনে ঐকমত্যের বিকল্প নেই
ড. হারুন রশীদ
সংবিধান সংশোধন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে এখন সরগরম চলছে। বিশেষ করে বিরোধী দল বিএনপি সংবিধান সংশোধনের ব্যাপারে কী ভূমিকা নেয়, সেটাই এখন আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। আর সরকারও শেষ পর্যন্ত কতটা অবিতর্কিত এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করতে পারে, সেটিও দেখার বিষয়। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর পরিহারসহ সংবিধানকে কতটা জনস্বার্থসংশিস্নষ্ট ও যুগোপযোগী করে সংশোধন করা যায় সেদিকেই সকলের দৃষ্টি দেয়া উচিত।
উচ্চ আদালতের রায়ে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হওয়ার পর সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়ে। এ লৰ্যে সরকার গত বছরের ২১ জুলাই সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে চেয়ারম্যান করে ১৫ সদস্যের সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটি গঠন করে। কমিটিতে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নাম চাওয়া হলেও তারা এতে সাড়া দেয়নি। বিএনপি এ কমিটি প্রত্যাখ্যান করে তাদের ভাষায় 'সর্বদলীয়' কমিটি গঠনের দাবি জানায়। এমনকি এক পর্যায়ে বিএনপি এ কমিটিকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করে এবং এ কমিটির সুপারিশে সংবিধান সংশোধন করা হলে তা তারা মানবে না বলে আগাম ঘোষণা দেয়। কিন্তু সংবিধান সংশোধনের ব্যাপারে সরকার অনমনীয় এবং কঠোর অবস্থান নিলে বিএনপি তার অবস্থান থেকে সরে আসে। তারা সরকারকে শর্ত দেয়_ সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করা হলে এ ব্যাপারে তারা সহযোগিতা করতে রাজি আছে। কিন্তু বিএনপির কথিত সমঝোতার পথে না এগুলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলের মতামত নিতে সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটিকে নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী সংসদীয় কমিটি বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নেয়। এবং বিরোধীদলীয় নেত্রীকে এ ব্যাপারে ২/১ দিনের মধ্যেই চিঠি পাঠানো হবে বলে জানানো হয়। এরই পরিপ্রেৰিতে বিএনপির পৰ থেকে এখন আবার বলা হচ্ছে, বিশেষ কমিটির সঙ্গে খালেদা জিয়া বৈঠকে বসবেন না। তবে আমস্ত্রণ পদ্ধতি সনত্মোষজনক হলে কমিটির সঙ্গে বৈঠকে বসতে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার পৰ থেকে একটি প্রতিনিধি দল পাঠানো যেতে পারে বলে বিএনপির পৰ থেকে বলা হচ্ছে। এ থেকে একটি জিনিস পরিষ্কার যে বরফ গলতে শুরম্ন করেছে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সংবিধান সংশোধন এখন এক অনিবার্য বাসত্মবতা। আদালতের নির্দেশ তো আছেই। এ ছাড়া অতীতে সামরিক সরকারগুলো প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে সংবিধানের ওপর এমন ভাবে কাঁচি চালিয়েছে যে তাকে আধুনিক এবং যুগোপযোগী করা এখন সময়ের দাবি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারায় ফিরে যেতে হলে আদালতের নির্দেশানুযায়ী বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কোন বিকল্প নেই। দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বর্তমান মহাজোট সরকার দেশের মানুষের চাহিদানুযায়ী সংবিধান উপহার দিতে সৰম হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। তবে যতই সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাক না কেন, সংবিধান সংশোধন হতে হবে অবশ্যই দলমত নির্বিশেষে সকলের মতামতের ভিত্তিতে।
এ বছর আমরা স্বাধীনতার চলিস্নশ বছর পার করব। রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর এবং অকারণ বিরোধিতায় আমাদের অনেক সময় পার হয়ে গেছে। এখন বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে সংবিধানের কিছু মৌল পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরী। ইতোমধ্যেই সংবিধানের কিছু বিষয় পরিবর্তনের ব্যাপারে জোরালো কথাবার্তা চলছে। বিসমিলস্নাহ থাকবে কিনা, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকবে নাকি সকল ধর্মের মানুষের সমানাধিকার নিশ্চিত হবে_ এসব বিষয়ে খোদ মহাজোট সরকারের নেতাদের মধ্যেই মতদ্বৈধতা দেখা দিয়েছে। মহাজোটের শরিক দল জাসদের সভাপতি ও সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটির অন্যতম সদস্য হাসানুল হক ইনু একটি দৈনিকের সঙ্গে সাৰাতকারে বলেছেন 'রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও বিসমিলস্নাহ সংবিধানে অনত্মর্ভুক্ত রাখা হবে প্রকাশ্য মুনাফেকি' (যুগানত্মর ১১ এপ্রিল ২০১১)। এ অবস্থায় সরকারের ভেতরেই দেখা যাচ্ছে সংবিধান নিয়ে নানা মত। কাজেই সংবিধান সংশোধনের ব্যাপারে বিসত্মারিত আলোচনার সুযোগ অবারিত রাখতে হবে। ইতোমধ্যেই সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটির বৈঠকে কিছু গুরম্নত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত এসেছে। এর মধ্যে_ জাতির পিতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বীকৃতি এবং সরকারী-আধাসরকারী ও বাংলাদেশ দূতাবাসে তা প্রদর্শনের বিষয়টি সংবিধানে অনত্মর্ভুক্ত করতে ইতোমধ্যেই একমত হয়েছে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি। সংবিধানে বিসমিলস্নাহ ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে বহাল রেখে সব ধর্মের অধিকার সমুন্নত রাখার ব্যাপারেও কমিটিতে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয়তা বাঙালী ও নাগরিকত্ব বাংলাদেশী রাখার বিষয়েও কমিটি একমত হয়েছে। এ ছাড়া ক্ষমতা দখলের জন্য শাসত্মির বিধান রেখে সংবিধান সংশোধনী করার সুপারিশ করবে বিশেষ কমিটি। এ লক্ষ্যে অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখল করা হলে তা বিশ্বাসঘাতকতা ও রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধ হিসেবে উলেস্নখ করে সংবিধানে অনত্মর্ভুক্ত করা হবে।
স্বাধীনতা ঘোষণা ও ঘোষণাপত্র সংবিধানের অংশ করার ব্যাপারেও চিনত্মা-ভাবনা চলছে।
সংবিধান আধুনিকায়নে জলবায়ু ইসু্য, নারী প্রতিনিধিত্ব (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুসারে) ও ৰুদ্র নৃতাত্তি্বক জনগোষ্ঠীর (আদিবাসী জনগোষ্ঠীর) অধিকার; এ তিন বিষয় জাতীয় মূলনীতিতে শর্তযুক্ত করে ( প্রোভাসু্য) অন্তর্ভুক্ত করতেও একমত হয়েছে কমিটি। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করতে কোন বাধা না থাকলেও ধর্মের অপব্যবহার রোধ ও জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে সংবিধানে নির্দেশনা যুক্ত করার পৰে বিশেষ কমিটি মত দেয়। বিতর্কিত সংসদের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হওয়ায় সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটি এ পদ্ধতি বাতিল নয়, বরং দুর্বলতাগুলো দূর করার পরামর্শ দেয়। তত্ত্ববধায়ক সরকারের মেয়াদ ৯০ দিন সুনির্দিষ্ট করে দেয়া এবং প্রয়োজনে এ মেয়াদ রাষ্ট্রপতির অনুমোদন সাপেক্ষে আরও ৩০ দিন বৃদ্ধি করার ব্যাপারেও আলোচনা চলছে।
এ ছাড়া সংসদ সদস্যদের বয়কট সংস্কৃতি থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হতে পারে। এক্ষেত্রে 'কার্যদিবস' শব্দটি বাদ দিয়ে সংসদে টানা ৯০ দিন অনুপস্থিত থাকলেই সদস্যপদ খারিজের বিধান সংবিধানে যোগ করার পক্ষেও সংসদীয় কমিটির সদস্যরা মতামত দিয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনারদের সংখ্যা নির্দিষ্ট করা ও ফ্লোর ক্রসিং বিষয়ে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়েও মতামত ইতোমধ্যে এসেছে। বিচার বিভাগকে জাতীয় সংসদের কাছে জবাবদিহি করার বিধান সংবিধানে যুক্ত করার পক্ষে ঐকমত্য হয় সংবিধান সংশোধনে গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির সদস্যরা।
প্রধান বিচারপতি ও বিচারকদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও ৭২-এর সংবিধানে ফেরত যাওয়ার ব্যাপারে মতামত এসেছে। (তথ্যসূত্র : বিডি নিউজ২৪ডটকম)
সংবিধান সংশোধন কোন সরকার, দল বা জোটের একক বিষয় নয়। আবার এটি মেয়াদওয়ারিও কোন বিষয় নয় যে একটি সরকারের মেয়াদান্তেই এর কার্যকারিতা শেষ হয়ে যাবে। সংবিধান অনুযায়ীই রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। একটি রাষ্ট্র কিভাবে পরিচালিত হবে, মানুষের মৌলিক অধিকার তাতে কতটা রক্ষা পাবে; এর সবই নির্ভর করে সংবিধানের ওপর। কাজেই সংবিধান সংশোধন সকলের মতামতের ওপর নির্ভর করে হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
বিএনপি ইতোমধ্যেই অভিযোগ করেছে যে, আওয়ামী লীগ সরকার তাদের ইচ্ছামাফিক সংবিধান সংশোধন করছে। এতে তাদের পুনরায় ৰমতায় আসার পথ সুগম হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের পৰ থেকেও বলা হচ্ছে, বিএনপি বিরোধিতার জন্যই বিরোধিতা করছে। আসলে এই বিরোধিতার কোন মৌল ভিত্তি নেই। রাজনৈতিক বিশেস্নষকরা বলছেন, দু'টি প্রধান দলই সংবিধানকে তাদের সুবিধানুযায়ী সংশোধন করতে চায়। এ অবস্থায় সংবিধান সংশোধনে সকল পৰের সঙ্গে অনুপুঙ্খ আলোচনা করেই সরকারকে এগুতে হবে। আশার কথা, সরকার ইতোমধ্যেই সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনার সিদ্ধানত্ম নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিশেষজ্ঞ কমিটির বৈঠকের পর বিরোধী দলের নেত্রীর সঙ্গেও তিনি কমিটিকে বৈঠকে বসার পরামর্শ দেন। কমিটি এ লৰ্যে উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। এখন বিএনপির উচিত হবে, এ সুযোগ কাজে লাগানো। শুধু সরকারী দলের ওপর দোষ চাপিয়ে বসে থাকলে চলবে না। বিএনপিকেও এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। তারা বিশেষজ্ঞ কমিটির সঙ্গে বসে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট মতামত দিতে পারে। সংসদে গিয়েও আলোচনায় অংশ নিতে পারে। অথবা সংবিধান সংশোধনে তাদের মতো করে একটি আলাদা বিলও তারা উত্থাপন করতে পারে।
সরকারী দলকেও বিরোধী দলকে আস্থায় নিয়ে সংবিধান সংশোধন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এ ব্যাপারে উভয় পৰের আন্তরিক উদ্যোগই দেশের মানুষ প্রত্যাশা করে।
harun_press@yahoo.com