মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ২০ এপ্রিল ২০১১, ৭ বৈশাখ ১৪১৮
জঙ্গী ও ধর্মান্ধতা বাংলাদেশের উন্নয়নে অন্যতম বাধা
ইকবাল আজিজ
গত চলিস্নশ বছরে বাংলাদেশে জনসংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে; কিন্তু আধুনিক শিৰিত বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের সংখ্যা বাড়েনি। বেড়েছে বিপুল সংখ্যক কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মান্ধ মানুষ যাদের মোটেই ধার্মিক বলা যায় না। কারণ ধার্মিক বলতে আমাদের চোখের সামনে যে মানুষের ছবি ভেসে ওঠে তিনি অবশ্যই মানবতাবাদী, সহানুভূতিশীল ও কল্যাণকামী। এ এক গভীর দুভার্গ্যজনক পরিস্থিতি। কখনও কখনও মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধের আগে আমাদের সমাজে আধুনিক যুক্তিবাদী শিৰিত মানুষের যে সংখ্যা ছিল এখন তার সংখা অনেক কমে গেছে সমাজজীবন থেকে। এর জন্য দায়ী কে? আমার মনে হয় এর জন্য দায়ী আমাদের কিছু নেতৃবন্দের ভুল সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা। সেই সঙ্গে জনগণের অসচেতনতার কারণেও ধীরে ধীরে বেড়েছে জঙ্গীদের শক্তি ও প্রভাব। এখন এদের শক্তি এমন ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে যে তা রীতিমতো আমাদের সমাজের আধুনিক গণতান্ত্রিক বিকাশ ও উন্নয়নের অন্যতম বড় প্রতিবন্ধক। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে শহীদ হওয়ার পর দেশের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ও অর্ধশিৰিত জঙ্গীরা সমাজজীবন থেকে তিলে তিলে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে ধ্বংস করেছে। দেশে সরকারী মাদ্রাসা ব্যবস্থা আগে থেকেই কার্যকর ছিল, এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশের আর্থিক সহায়তায় এদেশে বেসরকারী পর্যায়ে অসংখ্য মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে। রাজধানী ও দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় গড়ে ওঠা এ ধরনের মাদ্রাসায় সরকারী নজরদারি ছিল না বললেই চলে। এত কাল পরে জানা যাচ্ছে, এ ধরনের মাদ্রাসাই মূলত জঙ্গীদের আশ্রয় ও প্রশিক্ষণের নিরাপদ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এতকাল পরে এ দেশের সচেতন কিছু মানুষের চোখ যেন খুলেছে, এতকাল যেন শিৰাবিভাগ ও সচেতন জনগোষ্ঠী ঘুমিয়েছিল, বহু বছর পর যেন তাদের ঘুম ভেঙ্গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থে এসব মাদ্রাসা গড়ে তোলা হয়েছিল। এর একমাত্র উদ্দেশ্য, বাংলাদেশে একদল অর্ধশিৰিত ধর্মীয় কট্টরপন্থী গড়ে তোলা। এর ফলে সারাদেশ অচেতন অন্ধকার ও গভীর দারিদ্র্যে নিমজ্জিত থাকবে। শাসকশ্রেণীর পাশাপাশি শুধু একটি সুবিধাভোগী শ্রেণী লুটপাট করবে এ দেশের যাবতীয় ধনসম্পদ। আর ধর্মান্ধতার অন্ধকারে বেহুঁশ হয়ে থাকবে এ দেশের সাধারণ মানুষ। মধ্যপ্রাচ্যের কট্টরপন্থী ওহাবী এবং তাদের এদেশীয় সমর্থকরা বাসত্মবিকই বাংলাদেশকে মধ্যযুগের অন্ধকারে নিয়ে যেতে চায়।
একটি সূত্র জানিয়েছে, উগ্র ওহাবী মতবাদের ওপর ভিত্তি করে দেশে বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার কওমি মাদ্রাসা চলছে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। এখানে বাংলা, ইংরেজী, বিজ্ঞানের প্রবেশ নিষিদ্ধ। কওমি মাদ্রাসায় সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় বিষয়ের পাশাপাশি পড়ানো হয় জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মওদুদীর জীবনী। শিৰার্থীদের ইসলামের কল্যাণকর ও মানবতাবাদী রূপটি শেখানো হয় না। বরং জঙ্গীবাদের প্রয়োজনে সেখানে ইসলামকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়। এখানে শিৰার্থীদের শেখানো হয়, শক্তি প্রয়োগ করে কিংবা দরকার হলে জিহাদের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ৰমতা দখল করতে হবে। ইতোমধ্যে কওমি মাদ্রাসার অর্থায়নের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কোন কোন আনত্মর্জাতিক সংস্থা। কওমি মাদ্রাসা সংক্রানত্ম এক গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে, অনিয়ন্ত্রিত এ মাদ্রাসার সঙ্গে জঙ্গী নাশকতার সম্পর্ক রয়েছে। প্রচলিত শিৰানীতি এবং কোন ধরনের তদারকির বাইরে কওমি মাদ্রাসাগুলোয় আসলে ধর্মীয় শিৰার বাইরে কী হচ্ছে সে বিষয়ে ব্যাপক তদনত্ম দরকার। দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও উন্নয়নের স্বার্থেই তা করতে হবে। শিৰার ধরন, অর্থায়নের উৎস, শ্রেণীকৰের চিত্র, সাংগঠনিক বিন্যাসসহ সকল ৰেত্রেই রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। সরকারী নিয়মনীতিও নিয়ন্ত্রণের বাইরে কওমি মাদ্রাসা পরিচালিত হয়। জানা গেছে, কিভাবে বেহেশতে যাওয়া যাবে তার কাল্পনিক ভিডিওচিত্র দেখিয়ে এসব মাদ্রাসায় ছাত্রদের বিভ্রানত্ম করা হচ্ছে। একে কেন্দ্র করে বিসত্মার ঘটছে জঙ্গীবাদের। এগুলো নিঃসন্দেহে ধর্মবিরোধী কাজ। ইসলাম কখনও এ ধরনের অপতৎপরতা বা জঙ্গীবাদ সমর্থন করে না। এছাড়া এই মাদ্রাসাগুলো দেশের কোন কল্যাণ করছে না। তাই এখন সময় এসেছে, প্রায় ৪০ হাজার কওমি মাদ্রাসায় আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক শিৰা চালু দরকার। পাশাপাশি, শিৰার্থীদের ধর্মের কল্যাণমূলক দিক কিংবা ধর্মীয় নৈতিকতা শেখানো যেতে পারে। ইসলামে সব সময় নারীর অধিকারকে গুরম্নত্ব দেওয়া হয়েছে। আমরা ছোট থেকেই শুনেছি, মায়ের পায়ের নিচে সনত্মানের বেহেশত। ইসলাম ধর্মে মায়ের সম্মান ও অধিকারকে যত বড় করে দেখানো হয়েছে, তেমনটি খুব কম ধর্মেই আছে। অথচ এর কোন বাসত্মব প্রয়োগ মাদ্রাসা শিৰায় দেখা যায় না। মায়ের অধিকার বলতে নারীর অধিকারকেই বোঝায়। কিন্তু এ দেশীয় ধর্মীয় কট্টরপন্থীরা নারীর অধিকারকে সমর্থন করে না, এর মধ্যে দিয়ে এরা নিঃসন্দেহে ইসলামের মূল শিৰার অবমাননা করছে। এছাড়া ভারতবর্ষ বা বাংলাদেশে ইসলামের রূপ সব সময় কল্যাণকর ও প্রেমময়; তা কখনই ওহাবীদের আদর্শে হিংস্র ও ভয়ঙ্কর নয়। কারণ ইসলাম ধর্ম বাংলাদেশের সাধারণ মানুষদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আলস্নাহ প্রেমিক সুফি ও দরবেশদের মাধ্যমে। বর্ণবাদী শোষণে জর্জরিত সাধারণ মানুষের মধ্যে সুফিরা প্রেম ও মানবতার বাণী প্রচার করেছিলেন। এ কারণে বাঙালীরা ধার্মিক, নীতিবান ও মানবতার আদর্শে উজ্জীবিত। ইসলাম ধর্মের সুফিবাদী ও কল্যাণময় রূপটি বাঙালী মুসলমানকে কখনই সাম্প্রদায়িক করেনি। এ কারণে জাতীয় কবি কাজী নজরম্নল ইসলাম যখন ইসলামী গান বা শ্যামাসঙ্গীত লিখেছেন, তখন তা এতটুকু সাম্প্রদায়িক হয়নি বরং সেখানে মানবকল্যাণই প্রধান বলে বিবেচ্য হয়েছে। কাজী নজরম্নলের এসব ইসলামী মানবতাবাদী গান ধর্মীয় কট্টরপন্থীদের অবিরত শোনানো উচিত। তাহলে তারা হয়ত মানবপ্রেমে দীৰিত হবেন। কাজী নজরম্নল গেয়েছেন_
'ধর্মের পথে শহীদ যাহারা
আমরা সেইসে জাতি_
সাম্যমৈত্রী এনেছি আমরা বিশ্বে করেছি জ্ঞাতি।
নারীরে প্রথম দিয়াছি মুক্তি নরসম অধিকার_
পুরম্নষের গড়া প্রাচীর ভাঙ্গিয়া করিয়াছি একাকার।'
বাসত্মবিকই এই কল্যাণময় ও প্রেমময় ইসলামই বাঙালী মুসলমানের ধর্ম_এই কারণে সে কখনও সাম্প্রদায়িক হতে পারে না। মুফতি আমিনীর মতো মুষ্টিমেয় কিছু ধর্মীয় কট্টরপন্থী কখনই এ দেশের মানুষের কাছে শ্রদ্ধেয় নন। কারণ তিনি সরকারের নারী উন্নয়ন নীতি সমর্থন করেন না। অথচ ইসলাম সর্বদা নারীর উন্নয়ন কামনা করেছে। এছাড়া আমরা ছোট থেকে ধর্মের যে সহজ সুন্দর রূপটি দেখেছি, তা সবসময় জঙ্গীবাদের বিরম্নদ্ধে। আমরা সেই বিখ্যাত নৈতিক বাণীটি বিস্মৃত হইনি, যেখানে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, 'তোমার বাসায় ভোজনের সময় খোঁজ নেবে, তোমার প্রতিবেশী অভুক্ত আছে কিনা।' এর চেয়ে মহৎ বাণী আর কী হতে পারে। অথচ আমাদের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ কখনই কল্যাণময় সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেন না।
এদেশ থেকে জঙ্গী ও ধর্মান্ধতা দূর করতে সরকারকেই উদ্যোগী হতে হবে। এ ৰেত্রে তুরস্ক হতে পারে বাংলাদেশের জন্য আদর্শ রাষ্ট্র। ধর্ম বিষয়ে উচ্চশিৰার ব্যবস্থা থাকতে পারে; কিন্তু মাদ্রাসা শিৰার অবশ্যই ব্যাপক পরিবর্তন দরকার। কওমি মাদ্রাসা কখনই প্রকৃত ধার্মিক গড়ে তুলবে না বরং অর্ধশিৰিত ধর্মান্ধ তৈরি হবে এসব প্রতিষ্ঠানে, যা দেশের আধুনিক বিকাশের জন্য অন্যতম প্রতিবন্ধক। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারকে অবশ্য এ বিষয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধানত্ম নিতে হবে। সরকারকে অবশ্যই কওমি মাদ্রাসাসহ সব ধরনের নিয়ন্ত্রণহীন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর কতর্ৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশকে জঙ্গীদের কবল থেকে অবশ্যই রৰা করা দরকার। এ দেশে যেমন সঙ্গোপনে জেএমবি, হরকত-উল-জিহাদ, হিযবুত তাহরীরসহ অন্যান্য জঙ্গী সংগঠনের প্রভাব বাড়ছে, ঠিক তেমনই গত কয়েক বছর পশ্চিমবঙ্গ ও অসমে বেড়েছে বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনসমূহের প্রভাব। মূলত সেকু্যলার বাঙালী জাতীয়তাবাদ এদের আক্রমণের মূল লৰ্য।
তবে বাংলাদেশে জঙ্গীদের দমনে সরকারকে অবশ্যই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিতে হবে। তা না হলে বাংলাদেশের আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন কখনই সম্ভব হবে না। ইতোমধ্যে আনত্মর্জাতিক জঙ্গী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলেছে বাংলাদেশের জঙ্গীরা। এদের একটিই উদ্দেশ্য_ বাংলাদেশে তালেবানী স্টাইলে মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধতা প্রতিষ্ঠা। এ এক গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। দেশে প্রগতিশীল রাজনীতিকদের অবশ্যই এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়া দরকার।