মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ২০ এপ্রিল ২০১১, ৭ বৈশাখ ১৪১৮
অদ্ভুত ও আশ্চর্য ব্যক্তিদের মিলন
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
বাংলাদেশে সেকু্যলার রাষ্ট্র প্রবর্তিত হয়েছে। এই প্রবর্তনা 'ধর্ম', 'নীতি' ও 'রাজনীতির' নতুন ধারণা তৈরি করেছে। বাংলাদেশে সেকু্যলারিজমের যারা বিরোধী, তাদের ধারণা সেকু্যলারিজম পশ্চিম থেকে উদ্ভূত। দৰিণ এশিয়ায়, সেকু্যলারিজমের উদ্ভব ঘটেছে এই সব সমাজের রাজনৈতিক সমস্যা থেকে ও ভয়ঙ্কর ধর্মজ দাঙ্গা-হাঙ্গামা থেকে। সেকু্যলারিজমের উদ্ভব নিবিড়ভাবে যুক্ত আধুনিক জাতি-রাষ্টের সঙ্গে। দুই দিক থেকে সেকু্যলাজিমকে বৈধতা দিয়েছে আধুনিক জাতি-রাষ্ট্র। প্রথমত, চেষ্টা করা হয়েছে একই ধর্মের বিবদমান মজহাবগুলোর মধ্যে (শিয়া, সুনি্ন ও আহমদিয়া) এবং বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে (হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান) সর্বনিম্ন মতৈক্য খুঁজে বার করার, এবং দ্বিতীয়ত, ধর্মজ বিশ্বাস ও ধারণা বাদ দিয়ে একটি রাজনৈতিক এথিক ব্যাখ্যা করার। বাংলাদেশের সংবিধানে (১৯৭২) এই চেষ্টাই করা হয়েছে। শেষের মডেলটি আমরা গ্রহণ করেছি। সেকু্যলারিজমের এই মডেল বুদ্ধিজীবীদের দিক থেকে কেবল গ্রহণযোগ্য নয়, আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এই মডেলটি ছাড়া চলতেও পারে না। একটি আধুনিক জাতির এ দুটি বৈশিষ্ট্য, এই দুই বৈশিষ্ট্য আবার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেরও। দৰিণ এশিয়ায় ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক কিংবা ধর্ম, রাষ্ট্র ও আধুনিকতার সম্পর্ক বোঝার জন্য দরকার ধর্ম কিভাবে পাবলিক হয়েছে। যদি ধর্ম ভারতের মতো সিভিল সমাজ নির্মাণে সহায়ক হয় কিংবা ভারতের মতো লিবারেল মূল্যবোধ কেন্দ্র করে পাবলিক ডিবেট প্রমোট করে, তাহলে বলতে হয়, রাজনৈতিক ধর্ম আধুনিকতার সঙ্গে সঙ্গতিসম্পন্ন। আবার, পাকিসত্মানের মতো ধর্ম যদি চেষ্টা করে সিভিল সমাজকে শক্তিহীন করতে কিংবা ইরানের মতো ব্যক্তিক লিবার্টি ছেঁটে ফেলতে, তাহলে বলতে হয়, রাজনৈতিক ধর্ম আধুনিকতার বিরম্নদ্ধে এবং এনলাইটেনমেন্টের সর্বজনীন মূল্যবোধের বিরম্নদ্ধে এক পায়ে খাড়া। বাংলাদেশে, আমিনীর ইসলামী ঐক্যজোট, মুজাহিদীর জামায়াত এবং খালেদা জিয়ার বিএনপি ধর্মকে আধুনিক রাজনীতির অনত্মস্থ করার দরম্নন অর্থনীতি কিভাবে পরিচালিত হবে কিংবা জাতীয় শিৰা ব্যবস্থার মূল লৰ্য কি হবে, এসব ৰেত্রে ধর্মকে টেনে আনা হয়েছে এবং ধর্মের রাজনীতিকরণের ফলে বহুৰেত্রে আধুনিক হাইব্রিড তৈরি করা হয়েছে। ধর্মের হাইব্রিড, অর্থনীতির হাইব্রিড, শিৰার হাইব্রিড, বিজ্ঞানের হাইব্রিড দেখা দিয়েছে, ইসলামী নামকরণের মধ্য দিয়ে ধর্ম প্রবেশ করেছে রাজনৈতিক ডিবেটে। আধুনিকতার সঙ্গে সঙ্গতি সম্পন্ন ধর্ম কিংবা ধর্মকে আধুনিক করার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন আমিনীরা, মুজাহিদীরা, খালেদা জিয়ারা, এখান থেকে তারা পশ্চিমের শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে সংলাপ করে চলেছেন। তাদের প্রসত্মাব হচ্ছে : আধুনিক সমাজে ধর্ম একটি পজিটিভ রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করতে সৰম। সব ধর্ম নয়, কোন-কোন ধর্ম, তাদের ব্যাখ্যাত ইসলাম, সৰম এবং ইচ্ছুক পাবলিক ভুবনে প্রবেশ করতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে যুক্তিশীল ডিবেট করার জন্য। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তারা ধর্মের হাইব্রিড, অর্থনীতির হাইব্রিড, শিৰার হাইব্রিড, বিজ্ঞানের হাইব্রিড তৈরি করেছেন। তাদের দাবি তারাও আধুনিক, তবে ভিন্ন ধরনের আধুনিক। আমিনী, মুজাহিদী, খালেদা জিয়ার আধুনিকতা বিভিন্ন ধরনের লোকদের আধুনিক লিবারেল সমাজ থেকে ঝেটিয়ে বের করে দিয়েছে। শুরম্ন থেকেই, এদের সমাজ ব্যাখ্যা এক ধরনের লোকদের অধিকার থেকে ও সমস্যা থেকে বিদায় করে দিয়েছে যেমন : নারী, নারীর উত্তরাধিকার, ধর্মজ সংখ্যালঘু, আমিনীদের কাছে, মুজাহিদীদের কাছে, খালেদা জিয়াদের কাছে পাবলিক ডমেইন (রাষ্ট্র ৰমতা দখলের উঠোন) যুক্তিশীল ডিবেটের ফোরাম নয়। পাবলিক ডমেইন একটা এঙ্ক্লুসিনারি স্পেস, সেই স্পেসে বিরোধীদের, নারীদের, সংখ্যালঘুদের কোন জায়গা নেই। কথা বলবার অধিকার পাবলিক ভুবনে কারও নেই। ধর্মের অভিজ্ঞতা বিশেষ পাবলিক কালচারে বিপজ্জনক কিংবা বিতৃষ্ণা উদ্রেককারী। দৰিণ এশিয়ার পাবলিক ভুবন একটা শূন্য স্পেস নয় ডিবেট করার জন্য : এই স্পেসটা স্মৃতিভরা, আকাঙ্ৰা ভরা, ভয় ভরা এবং আশা-নিরাশা ভরা (দাঙ্গা-হাঙ্গামা, হত্যা, মানুষকে সাহায্য করা : এসব থেকে তৈরি হয়েছে ফের নতুন ডিসকোর্স)। এই পরিস্থিতি একটা পোড়োজমির পরিস্থিতি, যেখানে বাস করে ফাঁপা মানুষ, যেখানে যুক্তিও নেই এবং সিভিল সমাজ নেই, আছে কেবল ৰমতা, ৰমতার তৃষ্ণা। আমিনী, মুজাহিদী, খালেদা জিয়াদের ধর্মবোধ একদিকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিরম্নদ্ধে হুমকিস্বরূপ, অন্যদিকে মুক্তচিনত্মার নাগরিকদের লিবার্টির বিরম্নদ্ধে বিপজ্জনক সঙ্কেত। আমরা কেন আমিনীদের, মুজাহিদীদের, খালেদা জিয়াদের ঐশ্বরিক কর্তৃত্বের অধিকারী বলে ভাবব? ধর্মকে পাবলিক ডোমেইনে ফিরিয়ে এনেছেন বলেই কি তারা এই কর্তৃত্বের অধিকারী? বরং উল্টোটাই। তাঁরা নীতিগতভাবে ও রাজনৈতিকভাবে বিপদগ্রসত্ম বলেই আলস্নাহকে ব্যবহার করে একটা লিগ্যাল রাইটের দ্বারস্থ হয়েছেন। মানুষকে মানব অধিকারের মাধ্যমে মুক্ত করতে হবে। মানব অধিকার না থাকলে কি হয়? আবার বিশ্ব মানব অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য উন্মাতাল। লিবিয়ায় গাদ্দাফি ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছেন না। কিংবা গাদ্দাফিবিরোধী গণতান্ত্রিক শক্তি ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছেন না। গাদ্দাফি লড়াই করছেন তাঁর ব্যক্তিক শাসন ও পারিবারিক রাষ্ট্র অৰত রাখার জন্য। তিরিশ বছর ধরে তাঁর ব্যক্তিক শাসন চলেছে এবং পারিবারিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সকল স্বৈরাচারী উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। সিরিয়ায় পঞ্চাশ বছর ধরে ইমার্জেন্সি শাসন চলছে। এসব দেশ কি ইসলামিক দেশ? কিংবা মুসলমানদের দেশ? এসব দেশে লিবার্টি নেই, জাস্টিস নেই, ফ্রিডম নেই। আছে দাসত্ব। খালেদা জিয়া কিংবা আমিনী কিংবা মুজাহিদী এসব দেশের মানবাধিকারের দুর্গতি নিয়ে কথা বলেন না। বাংলাদেশের নড়বড়ে গণতন্ত্রকে নষ্ট করার জন্য এসব অদ্ভুত, আশ্চর্য ব্যক্তিরা একত্র হয়েছেন কোরান উদ্ধারের কথা বলে শরিয়ার জিন্দান প্রতিষ্ঠার জন্য। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি উজ্জ্বল করে আছে ১৯৭২-এর সংবিধানে। এই সংস্কৃতি সকল ব্যক্তির জন্য আলোক, সকলের জন্য গণতন্ত্র, সকলের জন্য মানববাধিকার এবং সবার ওপর স্বাধীন থাকার একটা নৈতিক প্রজেক্ট। এই প্রজেক্টের বিরোধী খালেদা জিয়ারা এবং আমিনীরা এবং মুজাহিদীরা। তারা প্রাতিষ্ঠানিক ভায়োলেন্সের দিকে দেশটাকে ঠেলে নিয়ে চলেছেন, গণতন্ত্রের বদলে পারিবারিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে অগ্রসর হয়েছেন, তারা মানুষের অধিকারের বদলে অধিকারহীনতার (গাদ্দাফিদের মতো) স্ট্র্যাটেজি শরিয়ার নামে গ্রহণ করেছেন। আমরা তো মানুষের অধিকার নিয়ে গণতন্ত্রের মধ্যে বেঁচে থাকতে চাই। সেজন্য গণতন্ত্র মানবিক, গণতন্ত্র আমাদের অভীষ্ট, গণতন্ত্র বেঁচে থাকার আলোক।