মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০১১, ১২ ফাল্গুন ১৪১৭
নদী বাঁচান
হাইকোর্টের সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ঢাকার চারপাশের ৪ নদী দখল-দূষণ বন্ধ না হওয়াটা অত্যনত্ম দুঃখজনক। বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারদিক ঘিরে থাকা ৪ নদী এখন দূষণের শেষ সীমায় এসে পৌঁছেছে। বুড়িগঙ্গা ছাড়াও তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদী রাজধানী ঢাকাকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে। এসব নদী দূষণের ফলে ঢাকার লোকজনই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। এসব নদীর পানি পান করার অনুপযোগী হয়েছে অনেক আগেই। এমনকি গোসল, হাতমুখ ধোয়ারও কোন জো নেই।
নদী দূষণ রোধে বার বার পদৰেপ নেয়া হলেও শেষ পর্যনত্ম তা কোন কাজে আসেনি। বরং অবস্থা আগের চেয়েও খারাপ। ঢাকার নদী তীরবর্তী অঞ্চলে রয়েছে প্রায় ২ হাজার শিল্প-কারখানা। এসব কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। এর ফলে নদীর পানির অবস্থা এমন হয়েছে যে দূর থেকেই পচা গন্ধ এসে নাকে লাগে। ক্রমাগত দূষণের ফলে নদী তীরবর্তী অঞ্চলের ফসল নষ্ট হচ্ছে। মরে যাচ্ছে মাছ। জীবজন্তু। জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ।
পরিবেশের জন্য ৰতিকর তরল বর্জ্য নির্গমনকারী শিল্প-কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন বাধ্যতামূলক হলেও বেশিরভাগ শিল্প-কারখানায় সেটি স্থাপন করা হয়নি। পরিবেশ অধিদফতরের এক জরিপে দেখা গেছে ঢাকা বিভাগের আওতায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্থাপিত ২৮৬টি ইটিপির মধ্যে ১২১টি বন্ধ অথবা অকার্যকর রয়েছে। এর ফলে অপরিশোধিত অবস্থায়ই এসব কারখানার বর্জ্য নদীতে গিয়ে পড়ছে। আর তা মারাত্মকভাবে নদী দূষণ করছে।
মাত্র ৮০-র দশকেও যেখানে বুড়িগঙ্গা নদীর পানি পানযোগ্য ছিল এখন সে পানি নানা রোগ জীবাণুতে ভরা। পান করা তো দূরের কথা স্পর্শ করলেই চর্মরোগসহ নানা রোগব্যাধিতে আক্রানত্ম হওয়ার আশঙ্কা। এ কারণে নদীতে জলজপ্রাণীর অসত্মিত্বও বিলীন প্রায়। যে নদীতে ট্যানারির কেমিক্যাল মিশ্রিত বর্জ্য পড়ছে টনকে টন সেই নদী কী করে তার প্রাণ রৰা করবে সেটি ভাবনার বিষয় বৈকি। আদালতের রায় অনুযায়ী কঠিন বর্জ্য ফেলা কিছুটা বন্ধ হলেও ওয়াসা, সিটি করপোরেশন ও শিল্প-কারখানার তরল বর্জ্য ফেলা বন্ধে তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি। অথচ তরল বর্জ্যই পানি দূষণের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী।
অপরদিকে বর্জ্য উত্তোলনেও খুব একটা অগ্রগতি নেই। বুড়িগঙ্গা নদীতে ঢাকা নদী বন্দরের মোট ৪০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের মধ্যে মাত্র এক কিলোমিটারের বর্জ্য উত্তোলন করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে বুড়িগঙ্গার ৩ কিলোমিটারসহ তুরাগের দেড় কিলোমিটার এলাকা থেকে বর্জ্য উত্তোলনের কথা থাকলেও ১০ মাসেও প্রকল্পটি শুরম্নই হয়নি। অবশ্য পরিবেশবিদরা বলছেন, বর্জ্য উত্তোলনের পাশাপাশি বর্জ্য ফেলা বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
এ ছাড়া দখলের ফলেও নদীর অবস্থা সঙ্গিন। বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশের নদীতীরে অসংখ্য কাঁচা-পাকা স্থাপনা গড়ে তুলেছে অবৈধ দখলদাররা। দখলমুক্ত না করতে পারলে নদী বাঁচানো যাবে না। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার ভারে রাজধানী ঢাকা নূ্যব্জ। বিপুল জনসংখ্যার জন্য পানি একটি বিরাট সমস্যা। দিন দিন পানির সত্মর নিচে নেমে যাচ্ছে। এর ফলে দেখা দিচ্ছে ভূমিকম্পসহ নানা দুর্যোগের আশঙ্কা। এ অবস্থায় পানির উৎস হিসেবে ঢাকার চারপাশের নদীগুলো ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য নদীগুলোকে দখল-দূষণমুক্ত করে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তবেই আমরা বাঁচব।