মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০১১, ২ ফাল্গুন ১৪১৭
খাদ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা
ভরা মৌসুমে চালের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়ে নানা মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে। এর একটা উত্তরও পাওয়া গেছে। আর তা হচ্ছে ধান চালকল মালিকদের মজুদপ্রবণতা। সেটি সম্ভব হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অস্বাভাবিক ঋণ প্রদানের কারণে। বিশেষজ্ঞ মহল থেকে বলা হচ্ছে ধান ও চাল মজুদের নেপথ্যে প্রত্যৰ ও পরোৰ ভূমিকা রাখছে মূলত বাণিজ্যিক ব্যাংকের অস্বাভাবিক ঋণ। ব্যাংকগুলো যদি নীতিমালা মেনে ঋণ দেয় তাহলে মজুদপ্রবণতা কমে আসবে। যার প্রভাব বাজারে পড়তে বাধ্য। এখন ব্যাংকগুলোকে নীতিমালা মানার ব্যাপারে জোরদার মনিটরিং করতে হবে। চালের মূল্য বৃদ্ধি ঠেকাতে এবং দাম স্থিতিশীল রাখতে হলে এটি করতেই হবে।
সরকার ধান চালকলের মালিকদের ঋণ দেয়ার জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে। এই ঋণ প্রদান সহজ করা হয়েছে বাজারে যাতে চাল সরবরাহ বিঘি্নত না হয়। অভিযোগ উঠছে বাজারে চাল সরবরাহের বদলে মালিকরা উল্টো তা গুদামজাত করে মজুদদারিতে নেমেছেন। সঙ্গত কারণেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাজারে।
ব্যাংকগুলো ঋণ দেয়ার ব্যাপারে রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নেমেছে। দিনাজপুরে ধান চালের বৃহত মোকামগুলো ঘিরে অনেক ব্যাংক তাদের শাখা পর্যন্ত খুলে বসেছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত সরকারের পৰ থেকে ব্যাংক ঋণের একটি সীমা নির্ধারণ করে দিলে এ অবস্থা হতো না। চালের মূল্য বৃদ্ধির জন্য বিশ্ববাজারের দোহাই দেয়া হলেও আসলে সিন্ডিকেট চক্রের কারসাজিই এ জন্য দায়ী। এ ৰেত্রে সরকারের অভ্যন্তরীণ মজুদ গড়ে তুলতে হবে। পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হলে এর কোন বিকল্প নেই। সরকার চালকল মালিকদের ঋণ দিয়ে উল্টো তাদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। যদি সরকার অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে খাদ্য মজুদ গড়ে তুলত এবং খাদ্য আমদানি অব্যাহত রাখত তাহলে সিন্ডিকেট চক্র কারসাজি করার সুযোগ পেত না। এ জন্য সংগ্রহমূল্য বাড়িয়ে দিয়ে যেমন অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে খাদ্য মজুদ করতে হবে তেমনি খাদ্য আমদানি করেও পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে।
আমন, আউশ ও বোরো মৌসুমে ৩ কোটি ৪০ লাখ টন চাল এবং ১০ লাখ টন গম উৎপাদিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে ৬০ লাখ মানুষ। তাদের খাদ্যপণ্য যোগাড় করতে নাভিশ্বাস উঠে যায়। এ জন্য সরকারকে এসব মানুষের জন্য খাদ্য সরবরাহ চালিয়ে যেতে হলে তার জন্যও মজুদ বাড়ানো ছাড়া বিকল্প আর কিছু হতে পারে না। বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। দেশে মজুদদারি চক্রও সক্রিয়। এ অবস্থায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়বে। তাছাড়া চাল প্রধান খাদ্যবস্তু হওয়ায় এর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অন্যান্য ৰেত্রেও পড়ে। ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধির ব্যাপারেও চালের মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করা হচ্ছে। পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও বাড়ছে তেলের দাম। খাদ্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার খাদ্য মজুদবিরোধী আদেশ পুনর্বহাল করেছে। এতে কোন খাদ্যপণ্য কতদিন মজুদ রাখা যাবে সেটি এখন সরকার নির্ধারণ করে দিতে পারবে। এর ইতিবাচক ফলাফল যাতে বাজারে পড়ে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। চাল, তেল, চিনিসহ খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। প্রয়োজনে উন্নয়ন কর্মকা- বন্ধ রেখে খাদ্যপণ্য আমদানি করা হবে বলেও প্রধানমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মজুদদারদের রাজনৈতিক প্রশ্রয় দান বন্ধসহ সরকারী মজুদ ও আমদানি বৃদ্ধি করতে হবে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় একটা কিছু করতেই হবে।

জনসংখ্যা কর্মসূচী
দাতাগোষ্ঠীর অসহযোগিতার কারণে সরকারের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা কর্মসূচী (এইচএনপিএসপি) মুখথুবড়ে পড়েছে। এছাড়া বেশ কয়েক বছর ধরে এই বিশাল প্রকল্পটি নানা পর্যায়ে দুর্নীতিতে আক্রান্ত। জানা গেছে, এসব কারণে গত প্রায় ৭ বছর ধরে এ ৰেত্রে সাফল্য অর্জিত হয়নি। তৃণমূল পর্যায়ে সরকারের পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচী বর্তমানে প্রায় স্থবির হয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের মতো নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত একটি দেশের জন্য এ পরিস্থিতি সার্বিক উন্নয়নের পথে ব্যাপক অনত্মরায়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমস্যাটি ৫৬ হাজার বর্গমাইল আয়তনের এ দেশটির অন্যতম প্রধান সমস্যা। অতিরিক্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এখানে উন্নয়নমূলক সব পরিকল্পনার যথাযথ বাসত্মবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। গত প্রায় দু'দশক ধরে দেশে সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচীর ৰেত্রে এক ধরনের নিষ্ক্রিয়তা পরিলৰিত হচ্ছে। এর কারণ কী? সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার, এমন গুরম্নত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সংশিস্নষ্টদের তেমন কর্মতৎপরতা লৰ্য করা যায় না। অথচ জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচীর সাফল্যের সঙ্গে দেশের উন্নয়ন কর্মসূচীর সাফল্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নিদেনপৰে এই একটি বিষয়ে দেশের সব রাজনীতিকদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা উচিত। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে জন্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সরকার ও বিরোধীদলীয় রাজনীতিকদের খুব একটা সোচ্চার বলে মনে হয়নি। বরং এটা শুধু দায়সাড়া গোছের একটি কর্মসূচী হিসেবে সরকারী পরিকল্পনা স্থান পেয়েছে।
আগের চেয়ে দেশ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচীর ৰেত্রে অনেক পিছিয়ে গেছে। সরকারের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা কর্মসূচীর (এইচএনপিএসপি) লৰ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০১১ সালের মধ্যে দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭২ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। জানা গেছে, এখনও দেশের মোট জনগোষ্ঠীর শতকরা ৪৪ ভাগ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার করে না। এ কারণে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কাঙ্ৰিত কর্মসূচী বর্তমানে অনেকাংশে ব্যর্থই হয়েছে বলা যায়। পরিসংখ্যা বলছে, দেশে বর্তমানে প্রতিবছর ২০ লাখ মানুষ বাড়ছে। একই সঙ্গে দ্রম্নত কৃষিজমির পরিমাণ কমে আসছে। বাংলাদেশের জন্য এ এক কঠিন সমস্যা।
বাংলাদেশকে জনসংখ্যা সমস্যার সমাধানের জন্য স্বনির্ভর হতে হবে। দাতাদের খেয়ালখুশির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। দাতাদের অনেক ধরনের খবরদারি ও শর্ত আছে। কিন্তু বাংলাদেশের সমস্যার সমভাগী তারা কেউই হবে না। রাজনীতিকদের উচিত দেশের স্বার্থে জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচীর প্রচার ও বাসত্মবায়নে ঐক্যবদ্ধভাবে পদৰেপ নেয়া প্রয়োজন। এ ৰেত্রে আলস্য ও স্থবিরতা দেশের জন্য ৰতির কারণ হবে।
তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা কর্মসূচীর বাসত্মবায়নে উদ্যোগী হওয়া দরকার। এ ৰেত্রে দাতাগোষ্ঠীর মুখাপেক্ষী না হয়ে স্বনির্ভর হওয়াই বিচক্ষণতার কাজ হবে। মনে রাখতে হবে, যে কোন পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নে সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার কোন বিকল্প নেই।