মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০১১, ২ ফাল্গুন ১৪১৭
ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা মূল্যায়ন
এ এম এম শওকত আলী
জানুয়ারির ৩০ তারিখে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা দলিলের ওপর মতামত গ্রহণের জন্য সরকারী নীতিনির্ধারক ও বেসরকারী গবেষকদের মধ্যে একটি আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। লক্ষণীয় যে, এ সভায় সরকারী কিছু নীতিনির্ধারক প্রস্তাবিত দলিলের কিছু বিষয়ে সমালোচনায় অংশগ্রহণ করেন। এতে দোষের কিছু নেই। কারণ, গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমেই যে কোন উন্নয়ন নীতিসংক্রান্ত দলিল সমৃদ্ধ হতে পারে। তবে এ বিষয়ে একটি প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক। সরকারী নিয়ম অনুযায়ী সরকার কর্তৃক প্রণীত দলিলের খসড়া প্রাথমিক পর্যায়ে সব মন্ত্রণালয়ের সুচিন্তিত মতামতের জন্য পাঠানো হয়। ঐ সময়ই প্রতি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী/ উপদেষ্টাসহ এ বিষয়ে লিখিত মন্তব্য করেন। এ মনত্মব্য হয় প্রাতিষ্ঠানিক অর্থাৎ মন্ত্রণালয়ের, ব্যক্তিগত নয়। কমিশন এ সভা আহ্বান করার পূর্বে প্রতি মন্ত্রণালয়ের লিখিত মতামত আহ্বান করেছিল কিনা, তা জানা নেই।
প্রাসঙ্গিক যে, এ ধরনের দলিলের খসড়া প্রণয়নের জন্য প্রথমে নিয়োজিত ব্যক্তিরা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিবর্গের মতামত গ্রহণ করেন। এর পরবর্তী পদক্ষেপটি হয় প্রণীত খসড়ার ওপর লিখিত মতামত আহ্বান। এর পরও আলোচ্যসভা অনুষ্ঠিত হয়। কারণ হতে পারে (ক) কিছু মন্ত্রণালয় হয়ত কোন মতামত পাঠায়নি এবং (খ) খসড়া চূড়ান্ত করার জন্য সভাটি ছিল আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ারই একটি অংশবিশেষ।
এ সভায় অনেক মতামত ব্যক্ত করা হয়। এক. ভাষার গুণগতমান উন্নত করতে হবে, বিশেষ করে সহজ এবং বোধগম্য করতে হবে। দুই. মাথাপিছু গ্রামের মানুষের আয় বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও কেন চালের দাম উর্ধমুখী সে বিষয়টি পরিকল্পনাবিদদের বিবেচনায় আনতে হবে। তিন. সামষ্টিক অর্থনীতির স্বার্থে শিল্পনীতির সঙ্গে আর্থিক নীতির সমন্বয় করতে হবে। চার. সুশাসনের বিষয়ে জোর দিতে হবে। পাঁচ. কৃষি খাতের ভর্তুকির জন্য সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি যার জন্য কৃষি খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ছয়. দলিলে লক্ষগুলো সঠিক হয়েছে তবে কৌশলগুলো অস্পষ্ট। সাত. আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে হলে এ দলিলে নীতি ও বিচার বিভাগের সেবার মান সম্পর্কে বিশেস্নষণ প্রয়োজন। আট. সুশাসনসহ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ওপর গুরম্নত্ব দিতে হবে। নয়. কৃষি জমির সর্বোত্তম ব্যবহারের বিষয়ে যত্নবান হতে হবে। দশ. প্রথম পঞ্চবার্ষিকী দলিলে সমবায়কে গুরম্নত্ব দেয়া হয়েছিল, বর্তমানে এ নিয়ে নতুন চিনত্মাভাবনা প্রয়োজন। এগার. বর্তমান সরকার যে রূপকল্প প্রণয়ন করেছে, তা সঠিকভাবে প্রতিফলিত করতে হবে।
ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা দলিলের মেয়াদকাল ধার্য হয়েছে ২০১০-১৫। ইতোমধ্যে প্রারম্ভিক সালের এক বছর অতিক্রানত্ম হয়েছে। এ কারণে খসড়া দলিলটি শীঘ্র চূড়ানত্ম হলে ভাল হয়। যদি বিলম্ব হয় তাহলেও ৰতি নেই। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায় যে, প্রতিবছরই বিলম্বে দলিলগুলো প্রকাশিত হয়। প্রশ্ন করা যেতে পারে, দলিলের অসত্মিত্ব যেখানে নেই সে অবস্থায় বার্ষিক পরিকল্পনা কিভাবে প্রণীত ও বাসত্মবায়িত হয়। কারণ, নিয়ম অনুযায়ী কোন উন্নয়ন প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের জন্য পাঠালে কমিশন এ বিষয়ে একটি নীতিগত প্রশ্ন করে। প্রেরিত উন্নয়ন প্রকল্প চলমান পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সঙ্গে উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কিনা। এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া তেমন কিছু কঠিন নয়। কারণ, কোন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা দলিল না থাকলেও এ দেশের উন্নয়নের ৰেত্রগুলো মোটামুটি একই ধরনের। এছাড়া আছে কিছু চলমান প্রকল্প এবং বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প। বর্তমানে সরকার অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কারণ হলো, বিগত কয়েক বছরে অনত্মত দুইটি উন্নয়ন সংক্রানত্ম দলিল চলমান ছিল যার মধ্যে একটি সরকার সংশোধিত আকারে অনুমোদন করেছে। দলিলটি দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র, যার বর্তমান শিরোনাম 'দিন বদলের পদৰেপ: দ্রম্নততর দারিদ্র্য বিমোচনের জাতীয় কৌশল ২ (সংশোধিত)।' এর মেয়াদ ২০০৯-১১। অন্যটি এ সরকারের আমলেই অনুমোদিত হয়েছে। শিরোনাম 'বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ স্ট্রাটেজি' এবং 'এ্যাকশন পস্নান ২০০৯'।
এর অতিরিক্ত বর্তমান সরকার ১৯৯৬-২০০১ সময়ে কয়েকটি উলেস্নখযোগ্য ৰেত্রে খাতওয়ারি এবং মন্ত্রণালয়ভিত্তিক উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন করেছিল। যেমন কৃষি ও পানিসম্পদ খাতসহ অন্য কিছু খাত। এসব ৰেত্রে কিছু এ্যাকশন পস্নানও করা হয়। প্রশ্ন উঠতে পারে যে, পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বিদ্যমান অবস্থায় এ সমসত্ম খাতওয়ারি উন্নয়ন পরিকল্পনা নীতির প্রয়োজন আছে কিনা। খাতওয়ারি উন্নয়ন নীতি প্রণয়নের কাজ শুরম্ন হয় আশির দশকে। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে, ৰমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গেই শুরম্ন হয় খাতওয়ারি উন্নয়ন নীতি প্রণয়নের জোর প্রচেষ্টা। কারণ এক দলের সরকার ভিন্ন আদর্শ ও মতাবলম্বী সরকারের প্রণীত নীতি গ্রহণ করতে নারাজ। এটা স্বাভাবিক হলেও বলা যায়, গভীরভাবে পরীৰা করলে প্রণীত উন্নয়ন নীতির সঙ্গে তেমন কোন পার্থক্য দৃশ্যমান নয়। যে বিষয়টি দৃশ্যমান তা হলো খাতওয়ারি গুরম্নত্বসহ ভাষাগত পার্থক্য।
অনেক সময় দেখা গেছে যে, একই মন্ত্রণালয়ের একই দলের মন্ত্রী বদলের কারণে প্রণীত এবং পূর্বে অনুমোদিত খাতওয়ারি নীতির এ্যাকশন পস্নানও পুনরায় পরিবর্তন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ফলশ্রম্নতিতে কোন এ্যাকশন পস্নানই বাসত্মবায়িত হয় না। একই দলের দুই মন্ত্রীর ব্যক্তিগত মতপার্থক্যের কারণে এক সময় একটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা দলিলও শেষ পর্যনত্ম গ্রহণ করা হয়নি। এ ধরনের পরিস্থিতি একাধিকবার হলে উন্নয়ন নীতি ও কৌশল বাসত্মবানের ধারা হ্রাস পায়।
আলোচ্য খসড়া পরিকল্পনা দলিল সম্পর্কে আরও মনত্মব্য প্রদানের সময় একজন উপদেষ্টা সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়টি উলেস্নখ করেন। এ সমসত্ম বিষয় কি সরকার একাই করতে পারবে? কারণ এ বিষয়টি আবহমানকাল ধরে বিভিন্ন নীতিনির্ধারকসহ উন্নয়ন পরিকল্পনা সংক্রানত্ম বিশেষজ্ঞরাও বলে আসছেন। এ বিষয়ে যে পরিস্থিতির তেমন কোন উন্নতি হয়নি সে কথা বলার অপেৰা রাখে না। বর্তমান সময়ে বিষয়টি অধিকতর জটিল হয়েছে। এ বিতর্কের শেষ নেই।
স্মরণ করা যেতে পারে যে, বিচার বিভাগের জবাবদিহিতার প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তাঁর ভাষায়, এ বিভাগের জবাবদিহিতা আলস্নাহ ও জনগণের কাছে, অন্য কারো কাছে নয়। বলা যায় যে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য কাঠামোগত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। কারণ রাষ্ট্রীয় সকল কর্মকা- সংবিধানসম্মত কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতা দু'টি রাষ্ট্রীয় অঙ্গের ওপর ন্যসত্ম_ এক. সংসদ এবং দুই. বিচার বিভাগ। বিচার বিভাগের বিচারকদের জন্যও কাঠামো রয়েছে। অধঃসত্মন বিচারকরদের জন্য উচ্চতর আদালত। উচ্চতর আদালতের বিচারকদের জন্য সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি। এর যথার্থতা নিয়ে বর্তমানে বিতর্ক শুরম্ন হয়েছে।
অন্যদিকে সংসদের কিছু সাংসদও বিচার বিভাগের জবাবদিহিতা সংসদের এখতিয়ারভুক্ত করতে আগ্রহী। বিচার বিভাগ এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নারাজ। প্রধান বিচারপতির মনত্মব্যে মনে হয়, এ দাবি বিচার বিভাগ নাকচ করে দিয়েছেন। অন্যদিকে একজন অংশগ্রহণকারী উপদেষ্টার সুপারিশ হলো_ আইনের শাসন চাইলে প্রসত্মাবিত দলিলে নীতিসহ বিচার বিভাগীয় সেবার মান সম্পর্কে বক্তব্য থাকা প্রয়োজন। সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী আইন মন্ত্রণালয় মামলা সম্পন্ন করার বিষয়ে সময়সীমা নির্ধারণ করতে আগ্রহী। এ পদৰেপ বিচার বিভাগীয় সেবার মান নিশ্চিত করার সঙ্গে জড়িত। এ বিষয়ে উচ্চতর আদালতের প্রতিক্রিয়া কি হবে তা এখনও জানা যায়নি। তবে বলা হয়, এ ধরনের কৌশল নির্ধারণ করতে হলে তা বিচার বিভাগের মাধ্যমেই করতে হবে। সাংবিধানিকভাবে বিচার বিভাগ স্বাধীন। কিন্তু সেটা মূলত বিচার কার্য সম্পন্ন করার জন্য। তবে প্রশাসনিক ৰেত্রে অধঃসত্মন আদালতের বিচার ব্যবস্থাপনা, নজরদারি এবং বিচারকদের নিয়োগ-বদলিও উচ্চতর আদালতের এখতিয়ারভুক্ত। এছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধিতে বিচার ব্যবস্থাপনা সংক্রানত্ম বিষয়ে হাইকোর্টের বিধি প্রণয়ন করার ৰমতা অর্পণ করা হয়েছে। এ কারণেই বিচার বিভাগ সম্পর্কিত সেবার নীতি ও মান উচ্চতর আদালতেরই এখতিয়ারভুক্ত।
সার্বিকভাবে বলা সম্ভব যে, রাষ্ট্রীয় তিনটি অঙ্গেরই জবাবদিহিতা সম্পর্কিত কাঠামো চূড়ানত্ম করা আবশ্যক। এর জন্য প্রয়োজন কোন অঙ্গই ৰমতার দম্ভ প্রদর্শন না করে সমন্বিতভাবে কাজ জন্য করার অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। এর মূল কারণ সংবিধানে তিনটি অঙ্গের অধিৰেত্র সুনির্দিষ্টভাবে বলা আছে। তিনটি অঙ্গই যদি ভ্রানত্ম ধারণার বশবর্তী হয়ে এককভাবে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হিসেবে অবস্থান গ্রহণ করে তাহলে সুশাসনের পরিবর্তে দুঃশাসনেরই অধিকতর আশঙ্কা।

১১ ফেব্রুয়ারি ২০১১
লেখক: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা