মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০১১, ২০ মাঘ ১৪১৭
নবায়নযোগ্য বিকল্প শক্তি_ সৌরশক্তি
নাদিরা মজুমদার
(গতকালের পর)
সৌরশক্তি বাংলাদেশের গ্রামীণ অবস্থা ও জীবনকে সুস্পষ্টভাবে একেবারেই বদলে দিতে পারে। যেমন, গ্রামীণ বিদ্যুতায়ন। অবশ্য বিদ্যুত-ইনফ্রাস্ট্রাকচার বলতে যা বোঝায় বাংলাদেশে তা নেই এবং কখনও ছিল না। জন্মের পর থেকে বিদ্যুত সরবরাহের যে ব্যবস্থা দেখে দেখে আমি এবং আমার মতো সবাই যারা ঢাকায় বড় হয়েছেন, তারা জানেন যে ঢাকা শহরে বিপজ্জনকভাবে মাথার ওপর দিয়ে তার টেনে বিদ্যুত সরবরাহ এখনও অব্যাহত রয়েছে। রাজধানী ঢাকার যদি এমন অবস্থা হয় তবে সমগ্র বাংলাদেশের অবস্থা সহজেই অনুমান করা যায়।
অবশ্য এই অবস্থার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে নতুন জাতীয় শক্তিনীতির আওতায়_ স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী, উভয় ক্ষেত্রেই, বিদু্যত-ইনফ্রাস্ট্রাকচার নির্মাণের বিষয়টিও একই গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, বিশেষ করে সৌরশক্তির মাধ্যমে গ্রামীণ বিদু্যতায়নের ক্ষেত্রে আধুনিক গ্রীড-সংযোজনের কথা ভুললে চলবে না। বিদ্যুতায়ন ছাড়াও সৌরশক্তির সাহায্যে জলসেচের ও পানীয়জল পাম্প, গ্রীষ্মের তপ্ত দিনে ঠাণ্ডা বা শীতল হওয়ার ব্যবস্থা ইত্যাদি হতে পারে। তাছাড়া জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট প্রকৃতির ব্যতিক্রমী ও অস্বাভাবিক আচরণ বাংলাদেশেও সুস্পষ্ট। যেমন, আমাদের ছোটকালে শীতের মাত্র কয়েকটা দিন কোন রকমে পাতলা একটা সোয়েটার গায়ে দিয়ে বা একখানা চাদর জড়িয়ে কাটিয়ে দেয়া যেত, সেই শীতকাল আর নেই, এখনকার শীতকাল যেমন দীর্ঘ, শীতের প্রকোপও বেশি; শীতকালে হিটার চালাতে হয়, এবং লোকে ঠাণ্ডায় মারাও যায়। অর্থাৎ জরুরীভিত্তিতে শীতের মৌসুমে ঘর উত্তাপ করা, গরম জল ব্যবহার অপরিহার্যের মধ্যে পড়ে, বিলাসের মধ্যে নয়। এর সন্তোষজনক মীমাংসার জন্য যে শক্তির প্রয়োজন তার উত্তর হতে পারে সৌরশক্তি।
বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় শক্তিনীতি তৈরি হয় ১৯৯৬ সালে; এবং বলা হয় যে এই শক্তিনীতি হবে অখ- কর্মপন্থার নির্মাণকাঠামোর অংশ। এই শক্তিনীতির প্রথম বাক্যের শুরু আত্মস্বীকারক্তি দিয়ে যে, অপেক্ষাকৃত কম উন্নয়নশীল দেশের বড় সমস্যা হলো শক্তি-উন্নয়ন কর্মকা-ের নিরবচ্ছিন্নতা অব্যাহত রাখা, এবং প্রধান কারণ: পুঁজির অভাব, কারণ, অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের একটা বড়োসড়ো অংশ বৈদেশিক সাহায্যভিত্তিক; অর্থাৎ তথাকথিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ফাইন্যান্স ডোনার বা দাতার এবং বহুপাক্ষিক এবং/বা মাল্টিলেটারাল ব্যাংকের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। এদের অনুমোদন না থাকলে ব্যয়বহুল প্রকল্পে আর্থিক বিনিয়োগ সম্ভব নয়। এতে অস্বাভাবিকতার কিছু নেই, রাগ করাও অবানত্মর; দানের পয়সা দিয়ে ভাতের বদলে বিরিয়ানি খাওয়ার সখ মেটানো চলে না নিশ্চয়। দাতারা এবং/বা মাল্টিলেটারাল ব্যাংক বৃহত বিনিয়োগে যেতে রাজি হয়নি বলে সরকার জাতীয় শক্তিনীতির বাসত্মবায়ন থেকে বিরত থাকে। দাতার অপারগতার কারণে বিকল্প সমাধান হিসেবে বাংলাদেশ তখন তাই ছোট ছোট প্রাইভেট কোম্পানিগুলোকে বিদু্যত উৎপাদনে ও পরিচালনায় অংশগ্রহণে উৎসাহ দেয়। এবং ব্যবস্থার কোন রদবদল হয়নি, অব্যাহত রয়েছে।
বৃহৎ বিনিয়োগে অনিচ্ছার সঙ্গে যুক্ত ছিল আরেকটি বড় কারণ_ সরকারী তত্ত্বাবধানে পরিচালিত শক্তি কোম্পানিগুলোতে উচ্চহারের 'সিস্টেম লস'। বাংলাদেশে সিস্টেম লসের পরিমাণ অগ্রহণযোগ্য হারে বেশি। (সিস্টেম লস তিন উপায়ে হতে পারে। প্রযুক্তিগত, যেমন তার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির কারণে শক্তির অপচয়; অপ্রযুক্তিগতও হতে পারে। যেমন বিদু্যত চুরি করা; এবং প্রশাসনগত লস বা ক্ষতি)। বাংলাদেশে এই তিনের সব ক'টি সিস্টেম লসই ঘটে থাকে। এমন ক্ষেত্রে তাই দাতার দোষত্রম্নটি খোঁজার পরিসর নেই। বরং সিস্টেম লস কমিয়ে আনায় মনোযোগ দেয়া হবে সঠিক পদক্ষেপ।
আধুনিক যে কোন দেশেই শক্তিনীতি জাতীয় পর্যায়ে প্রণয়ন করা হয় জাতীয় ইসু্য হিসেবে; যেহেতু জাতীয় ইসু্য তাই সমাধানের লক্ষ্যে রাজনৈতিক মতামত নির্বিশেষে বহুমুখী উপায়ের ও কৌশলের ভিত্তিতে প্রণীত হয়ে থাকে শক্তিনীতি। আধুনিক জনগণও এক্ষেত্রে দলগত লাভলোকসানের সন্ধানকারীকে বরদাসত্ম করতে রাজি নয়। অর্থাৎ জনগণ শক্তিনীতির মতো গুরম্নত্বপূর্ণ নীতির বিরতিহীন কার্যকারিতা দাবি করে। এ হলো রাষ্ট্রীয় রাজনীতি, দলগত রাজনীতি নয়।
এই মুহূর্তে ইনটিগ্রেটেড পলিসি ফ্রেমওয়ার্কের অধীন কোন শক্তিনীতি বাংলাদেশের নেই বলা যায়। তাই বাংলাদেশকে নতুন শক্তিনীতি প্রণয়নে মনোনিবেশ করতে হবে। আশা করা যায় যে, শক্তিনীতি হবে এমন যাতে গতানুগতিক শক্তি উৎসের, যেমন গ্যাস, কয়লা, তেলের ওপর নির্ভরশীলতা ক্রমশ কমিয়ে আনার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত থাকবে, তাই ফ্লোশীট থাকা বাঞ্ছনীয় হবে। গুরম্নত্ব থাকবে নবায়নযোগ্য শক্তি উৎসের, বিশেষ করে সৌরশক্তির ওপর; সৌরশক্তি উৎপাদনে বিশ্ব প্রচুর পরিমাণে এগিয়ে গেছে এবং এই অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে; দাতা রাজি নয় বলে বাংলাদেশ এখনও সৌরশক্তির এই রেসের অংশীদার হতে পারেনি। শক্তি উৎসের অঙ্গনে সূর্য বা সূর্যালোক এক নম্বর স্থান অধিকার করে আছে, উৎস হিসেবে এর বার্ষিক ব্যবহারের বৃদ্ধি প্রক্রিয়া অনত্মত ৩৫ শতাংশ। সুষ্ঠু শক্তিনীতির গুরম্নত্ব আর্থ-সামাজিক দায়িত্ব পালনেই সীমিত নয়, জাতীয় রাজনৈতিক মর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধির মাধ্যমও বটে। বাংলাদেশকে হীনতার অবস্থান থেকে ওপরে তুলে আনতে পারে সৌরশক্তি।
আধুনিক, যুগোপযোগী, অতএব তাই উৎকৃষ্ট শক্তিনীতি তিনটি 'ই (৩ঊ)'-র ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়, এগুলো হলো শক্তির নিরাপত্তা (এনার্জি সিকিউরিটি), অর্থনৈতিক উন্নয়ন ((ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট) ও পরিবেশ সংরক্ষণ (এনভায়রনমেন্টাল প্রটেকশন) ।
সৌরশক্তির রেসে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি হিসেবে আনত্মর্জাতিক শক্তি এজেন্সি কাছ থেকেও পরামর্শ চাওয়ার কথা ভেবে দেখা যেতে পারে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগের (ওঊঅ) প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৭৪ সালে, ১৯৭৩ সালের তেল সঙ্কটের পর পরই। শুরম্নতে এর কর্মসূচী সামান্য ভিন্ন মেজাজের ছিল; পরবর্তীকালে ওঊঅ সদস্যদেশগুলোর শক্তি উপদেষ্টার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়; ওঊঅ অবশ্য সদস্য নয় এমন দেশকেও শক্তিনীতির ক্ষেত্রে বুদ্ধিপরামর্শ দিয়ে থাকে। চীন, ভারত, রাশিয়া সদস্য নয়, তবে দরকার মতো বুদ্ধিপরামর্শ নিতে দ্বিধা করে না। উপরোক্ত তিন 'ই'-কে ফোকাস করার দায়িত্ব দিয়ে এজেন্সির ম্যান্ডেটকে আরো বাড়ানো হয়েছে। শেষোক্ত ঊ-র আওতায় এজেন্সির কাজ হলো জলবায়ুগত পরির্তনের তীব্রতা কিভাবে উপশম সম্ভব, সেই বিষয়কে ফোকাস করা। বিকল্প শক্তিসহ নবায়নযোগ্য শক্তি, যুক্তিসিদ্ধ শক্তিনীতি এবং বহুজাতিভিত্তিক শক্তি প্রযুক্তি সহযোগিতা ইত্যাদির সংবর্ধনও এজেন্সির কার্যক্ষমতার মধ্যে পড়ে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শক্তিনীতির বাসত্মবায়নের প্রথম পদক্ষেপ হবে 'অগ্রহণযোগ্য সিস্টেম লসের' মীমাংসা করা। বাংলাদেশের উন্নয়ননীতি ও প্রকল্পের বাসতবায়ন ব্যাপকভাবে দাতানির্ভর; এটা অনেকটা 'বেগিং সিন্ড্রোমের' কথা মনে করিয়ে দেয়। বাংলাদেশকে নীতিগতভাবে এই হীনতার বেড়া ভাঙ্গতে হবে। পুরনো বন্ধুদেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আবার উজ্জীবনে বাংলাদেশকে যত্নবান হতে হবে, বিশেষ করে সেসব দেশ যারা বাংলাদেশকে এক সময় প্রযুক্তিসহ নানাভাবে সাহায্য করেছিল। ১৯৮৯ সালে বিশ্ব রাজনীতিতে পরিবর্তনের ফলস্বরূপ অনেক দেশই বাংলাদেশে তাদের দূতাবাস বন্ধ করে দেয়; অর্থাৎ আপাতদৃষ্টে বাংলাদেশের ব্যাপারে আগ্রহে তাদের ঘাটতি দেখা দেয়। কিন্তু বাংলাদেশও সেসব দেশের সঙ্গে বন্ধুসুলভ সম্পর্ক বজায় রাখা থেকে বিরত থাকে। যেমন, বার্লিনে বাংলাদেশের দূতাবাসের জার্মানিসহ আরও পাঁচটি দেশের: অস্ট্রিয়া, চেক রিপাবলিক, হাঙ্গেরি, সেস্নাভাকিয়া ও সেস্নাভেনিয়ার দায়িত্ব পালন করার কথা। সাইজে ছোট বলেই হয়ত বিশাল জার্মানির সঙ্গে বাড়তি পাঁচটি দেশকে জুড়ে দেয়া হয়েছে। এই বিশাল অঞ্চলের কূটনৈতিক বন্ধুত্ব পালন কতটা হচ্ছে, বাংলাদেশকে সিরিয়াসলি পুনর্বিবেচনা করতেই হবে। মনে রাখা দরকার যে, পাঁচটি দেশই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য দেশ, এবং অর্থই যদি প্রধান সমস্যা হয় তবে জাতীয় স্বার্থে আর্থিক সাশ্রয়ের সংজ্ঞার পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে কিনা, সেটাও নতুন করে ভাবতে হবে। একইভাবে, ব্রাসেলসে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্ম প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিকে ফলপ্রসূ করার কৌশলগত উন্নতির কথাও ভেবে দেখতে হবে।
শক্তিনীতির বাসত্মবায়নের ক্ষেত্রে বিশেষ করে প্রস্তুতিপর্বে বাংলাদেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যাবিভাগসহ অন্যান্য গবেষণাকেন্দ্রের ভূমিকা ও উপস্থিতিকে আরো তীব্র করতে হবে। কারণ এরাই করবে নানাবিধ জটিল হিসেব ও তৈরি করবে গ্রহণযোগ্য যুক্তি। নবায়নযোগ্য সৌরশক্তিকে সমাজের সঙ্গে, জনগণের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে; তাই থাকতে হবে পরিকল্পিত ব্যবস্থার; প্রধান দায়িত্ব পালনের দায় হবে মিডিয়ার। মিডিয়াকে তাই সৌরশক্তি কি, কেন ইত্যাদি বুঝতে হবে। দু্রত সংবাদ লিখে প্রেসে পাঠানোর সময় কোন সাংবাদিকেরই সম্পূর্ণ বিষয়ে পরিচিত হওয়ার মতো সময় থাকে না। তাই প্রায়োরিটি ভিত্তিতে মিডিয়ার প্রতিনিধিদের জন্য ব্যবস্থা করতে হবে ওয়ার্কশপের; প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, পদার্থবিদ্যা বিভাগ ও অন্যান্য গবেষণাকেন্দ্র প্রজেক্ট হিসেবে এই দায়িত্ব অনায়াসে পালন করতে পারে। এই প্রসঙ্গে বোধ করি বলা অবান্তর হবে না যে, ১৯৮০-র দশকের শুরম্নতে যখন বাংলাদেশে মেট্রিক সিস্টেম প্রচলনের উদ্যোগ নেয়া হয়, সে সময়ে বিজ্ঞানমন্ত্রী, যিনি পেশাগতভাবে ছিলেন প্রকৌশলী, মেট্রিক সিস্টেমের সুবিধাদি ব্যাখ্যার জন্য সাংবাদিকদের সঙ্গে অর্ধেকটা দিন কাটাতে দ্বিধা করেননি। এতে ফলও ভাল হয়েছিল। (সমাপ্ত)
nadirahmajumdar@gmail.com