মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ২৮ অক্টোবর ২০১৩, ১৩ কার্তিক ১৪২০
নেইমার বন্দনায় শত্রু-মিত্র সবাই
জাহিদুল আলম জয় ॥ গত কয়েক বছর ধরেই এল ক্লাসিকোতে সব আলো থাকে লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর দিকে। শনিবার রাতেও স্পটলাইট ছিল এই দুই মহা তারকার দিকে। তবে পার্শ্বচরিত্রে ছিলেন নেইমার ও গ্যারেথ বেল। দলবদলের ইতিহাসে সবচেয়ে দামি তারকা বেল ব্যর্থ হলেও সব আলো নিজের করে নিয়েছেন নেইমার। ব্রাজিলিয়ান এই সেনসেশন পরশু রাতে ন্যু ক্যাম্পে আরেকবার চিনিয়েছেন নিজের জাত। ক্যারিয়ারের প্রথম এল ক্লাসিকোতে তিনি ছিলেন সমহিমায় উজ্জ্বল। আর তাতেই ১৬৭তম লা লীগা এল ক্লাসিকোতে বার্সিলোনা ২-১ গোলে হারিয়েছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদকে। মূলত নেইমারের উদ্ভাসিত নৈপুণ্যের কারণেই লম্বা সময় পর ঘরের মাঠে গ্যালাক্টিকোদের হারাতে সক্ষম হয়েছে কাতালানরা। সঙ্গত কারণেই শত্রু-মিত্র সবাই এখন ব্যস্ত নেইমার-বন্দনায়।
ক্লাসিকোর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে এগিয়ে থেকেই বার্সার আতিথ্য নিয়েছিল রিয়াল। পরশু রাতের ম্যাচের আগে শেষ পাঁচ ম্যাচের একটিতেও জিততে পারেনি বার্সা। তিনটিতে জয় রিয়ালের। অপর ম্যাচ দুটি অমীমাংসিত থাকে। শুধু তাই নয়, বার্সার মাঠে সর্বশেষ দুই ম্যাচে হারেনি রিয়াল। একটিতে জয় ২-১ গোলে, অপরটি ড্র হয় ২-২ গোলে। তরতাজা এসব স্মৃতি নিয়েই লা লীগার এল ক্লাসিকোতে মাঠে নেমেছিল কার্লো আনচেলত্তির দল। কিন্তু নেইমারের বিস্ফোরক নৈপুণ্যে এবার সাফল্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেননি রোনাল্ডো, রামোস, বেনজেমারা। এ জন্য অবশ্য ভাগ্যদেবীকে দোষারোপ করতেই পারে রিয়াল। কেননা ম্যাচে গোলের বেশ কয়েকটি সুযোগ হাতছাড়া ছাড়াও রেফারিং তাদের বিরুদ্ধে যায়। এমন অভিযোগ করেছেন স্বয়ং রিয়াল অধিনায়ক সার্জিও রামোস। ২১ বছর বয়সী নেইমার নিজের প্রথম বড় ম্যাচটা উপভোগ করেছেন বলে জানান। তিনি বলেন, যোগ্যতর দল হিসেবেই ম্যাচটি জিতেছে বার্সা। নেইমার বলেন, যে ম্যাচটি খেলা সব খেলোয়াড়ের স্বপ্ন, তেমন এক ম্যাচে গোল করতে পারা আবেগময় ব্যাপার। আমি স্পেশাল এই গোলটি করতে পেরে ভীষণ খুশি। তবে আমরা তিনটি পয়েন্ট পেয়েছি এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমার্ধে নেইমারের চোখ ধাঁধানো গোলে স্বাগতিক বার্সিলোনা এগিয়ে যাওয়ার পর গোল পরিশোধের বেশ কয়েকটি সুযোগ পেয়েছিল অতিথিরা। প্রথমার্ধের শেষ মিনিটে রোনাল্ডোর ক্রস ডি-বক্সে সামি খেদিরাকে খুঁজে পেলেও অসাধারণ দক্ষতায় হাঁটু দিয়ে তা প্রতিহত করেন বার্সা গোলরক্ষক ভিক্টর ভালদেস। ফিরতি বল ডিফেন্ডার আদ্রিয়ানোর হাতে লাগলে পেনাল্টির দাবি জানান খেদিরা। কিন্তু তাতে কর্ণপাত করেননি রেফারি। বিরতির পর ৫৭ মিনিটে গোল করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন রোনাল্ডো নিজেই। কিন্তু ডি-বক্সের মধ্যে ক্রোয়েশিয়ান মিডফিল্ডার লুকা মডরিচের পাস থেকে পাওয়া বলে তাঁর বাঁ পায়ের জোরালো শট অসাধারণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন ভালদেস। ৭১ মিনিটে ন্যায্য পেনাল্টিবঞ্চিত হয় রিয়াল। এ সময় ডি- বক্সে রোনাল্ডোকে অবৈধভাবে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন বার্সার আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার জাভিয়ের মাশ্চেরানো। কিন্তু পর্তুগিজ তারকার পেনাল্টির আবেদনে সাড়া দেননি রেফারি আলবার্টো আন্ডিয়ানো। রিয়ালের হয়ে ম্যাচে গোলের সেরা সুযোগটা পেয়েছিলেন বেলের বদলি হিসেবে মাঠে নামা ফরাসী স্ট্রাইকার করিম বেনজেমা। তবে ৭২ মিনিটে মডরিচের পাসে দূর থেকে নেয়া বেনজেমার ডান পায়ের দুর্দান্ত শট ফিরে আসে ক্রসবারে লেগে।
শেষ পর্যন্ত তাই জয়ের হাসি নিয়েই মাঠ ছাড়ে তৃপ্ত বার্সিলোনা। ১০ ম্যাচ শেষে অপরাজিত থেকে ২৮ পয়েন্ট নিয়ে তালিকার শীর্ষে মেসি, জাভি, ইনিয়েস্তারা। এক ম্যাচ কম খেলে ২৪ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে এ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ। ২২ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে রিয়াল। বড় বাধা পেরিয়ে শিরোপা অক্ষুণœ রাখার মিশনে তাই ভালমতোই এগিয়ে গেল কাতালানরা। লা লীগায় পরশুর অন্যান্য ম্যাচে সেল্টা ডি ভিগো ৫-০ গোলে মালাগাকে, গ্রানাডা ১-০ গোলে এলচেকে ও লেভান্তে ৩-০ গোলে পরাজিত করে এস্পানিওলকে।
ঘরের মাঠে শুরু থেকেই অতিথি রিয়ালের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে খেলতে থাকে স্বাগতিক বার্সিলোনা। মেসি, নেইমাররা, জাভি, ইনিয়েস্তারা ছোট পাসে বল দেয়া নেয়া করে ব্যতিব্যস্ত করে রাখেন রিয়াল ফুটবলারদের। জবাবে রোনাল্ডো, বেলরা প্রতিপক্ষের জন্য এ অর্ধে তেমন হুমকি হয়ে উঠতে পারেননি। ম্যাচের ১৯ মিনিটে বার্সাকে এগিয়ে দিয়ে ক্লাসিকোতে স্বপ্নের অভিষেকটা স্মরণীয় করে রাখেন নেইমার। ইনিয়েস্তার ডিফেন্স চেরা পাস ধরে নেইমারের বুদ্ধিদীপ্ত শট দুই ডিফেন্ডারের পায়ের ফাঁক গলে জালে জড়ালে উল্লাসে মেতে ওঠে প্রায় এক লাখ দর্শকে ঠাসা স্টেডিয়াম। এল ক্লাসিকোতে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ড নিজের করে নেয়ার দারুণ একটি সুযোগ এসেছিল মেসির সামনে। ১৮টি গোল নিয়ে আপাতত রিয়ালের স্বদেশের কিংবদন্তি আলফ্রেডো ডি স্টেফানোর সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে থাকা এই ফুটবলার ২২ মিনিটে বক্সের ঠিক বাইরে থেকে যে শটটি নিয়েছিলেন তা অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। বিরতির পর আধিপত্য বিস্তার করে খেলেও রেফারি ও ভাগ্যের সহায়তা না থাকায় গোল পায়নি রিয়াল। উল্টো ৭৮ মিনিটে পাল্টা আক্রমণ থেকে বার্সার জয় নিশ্চিত করা গোল করেন এ্যালেক্সিস সানচেজ। চেস ফ্যাব্রিগাসের বদলি হিসেবে নেমে নেইমারের বাড়ানো বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গোললাইন ছেড়ে বেরিয়ে আসা রিয়াল গোলরক্ষক ডিয়েগো লোপেজের মাথার ওপর দিয়ে চিপ করে দর্শনীয় গোলটি করেন চিলির স্ট্রাইকার।
এই গোলেই রিয়ালের হার নিশ্চিত হয়ে যায়। ম্যাচের শেষ মিনিটে ভালদেসের ভুলে ব্যবধান কমায় রিয়াল। রোনাল্ডোর পাস থেকে বদলি জেসের শট তাঁর হাত ফস্কে জালে জড়ালে সমতায় ফেরার আশা জেগে ওঠে অতিথিদের মনে। কিন্তু এরপর আর কোন পায়নি রিয়াল। শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে বার্সিলোনা। এর ফলে দুই কোচের প্রথম এল ক্লাসিকোতে জয়ের স্বাদ পেলেন জেরার্ডো মার্টিনো। ধ্রুপদী লড়াইয়ে দুর্দান্ত পারফর্মেন্স করায় নেইমারের প্রশংসায় মেতেছেন সবাই। বার্সা সতীর্থরা তো বটেই, প্রতিপক্ষ রিয়ালের ফুটবলাররা ও কোচ উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন ব্রাজিলিয়ান তারকার। রিয়াল কোচ আনচেলত্তি বলেন, নেইমার অসাধারণ খেলেছে। ম্যাচের গতিপ্রকৃতি সে একাই পাল্টে দিয়েছে। ন্যু ক্যাম্পে হারের কারণ হিসেবে রেফারিকে দোষারোপ করে রিয়াল অধিনায়ক রামোস বলেন, এমন কিছু বিষয় আছে, যা নিয়ে আপনি কিছুই করতে পারবেন না। আমাদের হারের বিষয়টিও তেমন। রেফারি ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণ করে দিয়েছে। স্প্যানিশ এ ডিফেন্ডার আরও বলেন, রেফারি পরিষ্কার দুটি পেনাল্টি থেকে আমাদের বঞ্চিত করেছেন। একটি আদ্রিয়ানোর হ্যান্ডবলের। আর অন্যটি মাশ্চেরানো ডি-বক্সে রোনাল্ডোকে ফাউল করলে। কিন্তু রেফারি তা আমাদের দেননি, যা অন্যায়। এর জবাব দিয়েছেন বার্সা মিডফিল্ডার সার্জিও বুসকুয়েটস। তিনি বলেন, হারের পর রেফারিকে দোষারোপ করা সহজ একটা অজুহাত। কিন্তু মৌসুমজুড়ে এই অভিযোগটা অন্যান্য দলও অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাতে পারত। কারণ, এই মৌসুমেই অন্য অনেক ম্যাচে রিয়াল এই রকম অনাকাক্সিক্ষত সুবিধা পেয়েছে। যেমন গ্রানাডা, এলচে ও রিয়াল বেটিসের বিরুদ্ধে ম্যাচ।
ম্যাচ শেষে বার্সা কোচ জেরার্ডো মার্টিনো বলেন, আমরা শুরুতে ভালই খেলছিলাম। কিন্তু এরপরই পিছিয়ে পড়তে শুরু করি। মেসির ক্ষেত্রেও এই কথা সত্যি। অবশ্য ও কঠোর পরিশ্রম করছে। আমি ওর পারফর্মেন্সও যথেষ্ট মূল্যায়ন করি। নেইমারের প্রশংসা করে তিনি বলেন, নেইমার দুর্দান্ত খেলেছে বটে, তবে আমি ওকে এর চেয়েও ভাল খেলতে দেখেছি। ক্লাসিকোতে ওর গোলটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ, তবে আমি ওর কাছ থেকে এর চেয়ে ভাল খেলা দেখেছি।